টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের একটি জেলা — আয়তনে বিভাগের সবচেয়ে বড়, যমুনা নদীর পূর্ব তীরে, "উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার" নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে মহকুমা থেকে জেলা হয়। এখানে ১২টি উপজেলা, ১১টি পৌরসভা, ১২০টি ইউনিয়ন, ১৩টি থানা ও ৮টি সংসদীয় আসন। তাঁতের শাড়ি, পোড়াবাড়ির চমচম আর মধুপুরের শালবন ও আনারসের জন্য টাঙ্গাইল বিখ্যাত।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত দেশের মধ্যাঞ্চলের একটি জেলা। হাতে বোনা তাঁতের শাড়ি, পোড়াবাড়ির চমচম, মধুপুরের শালবন ও আনারস, মোগল আমলের আতিয়া মসজিদ, বিভিন্ন জমিদার বাড়ি এবং যমুনা সেতুর জন্য জেলাটি দেশজুড়ে পরিচিত।
- বিভাগ: ঢাকা
- জেলা গঠন: ১ ডিসেম্বর ১৯৬৯
- আয়তন: প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিলোমিটার
- জনসংখ্যা: প্রায় ৪০ লাখ (জনশুমারি ২০২২)
- উপজেলা: ১২টি
- জাতীয় সংসদের আসন: ৮টি
নামকরণ
টাঙ্গাইল নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে, তবে কোনোটিই চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। প্রচলিত আছে যে স্থানীয় ভাষায় উঁচু ভূমিকে ‘টান’ বলা হতো, আর ‘আইল’ অর্থ জমির সীমানা বা উঁচু পথ — এই দুই শব্দ মিলে ‘টান-আইল’ থেকে ‘টাঙ্গাইল’ নামের উদ্ভব। আরেকটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, একসময় এ অঞ্চলে ঘোড়ায় টানা গাড়ি ‘টাঙ্গা’-র ব্যাপক প্রচলন ছিল, সেখান থেকেই এই নাম।
পুরোনো নথিপত্রে এ অঞ্চল মূলত ‘আটিয়া’ (আতিয়া) নামে পরিচিত ছিল। ১৮৭০ সালে মহকুমা সদর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে স্থানান্তরিত হওয়ার পর টাঙ্গাইল নামটি প্রশাসনিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায়।
ইতিহাস
মোগল আমলে এ অঞ্চল আটিয়া পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সাঈদ খান পন্নী নির্মিত আতিয়া মসজিদ সে সময়ের স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। পরবর্তী সময়ে করটিয়া, ধনবাড়ী, মহেড়া, পাকুটিয়া ও হেমনগরের মতো বিভিন্ন জমিদার পরিবার এ অঞ্চলে প্রভাবশালী ছিল, তাদের নির্মিত প্রাসাদ ও স্থাপনা আজও দর্শনীয়।
ব্রিটিশ আমলে টাঙ্গাইল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৮৭০ সালে মহকুমা সদর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে সরিয়ে আনা হয়। ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘কাগমারী সম্মেলন’ এ অঞ্চলের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধারা সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত হয় — দিনটি প্রতিবছর টাঙ্গাইল মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়।
ভৌগোলিক অবস্থান ও নদ-নদী
টাঙ্গাইল জেলা ঢাকার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এর উত্তরে জামালপুর, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ এবং পশ্চিমে যমুনা নদীর ওপারে সিরাজগঞ্জ জেলা।
জেলার পশ্চিমাংশ মূলত যমুনা ও এর শাখানদীগুলোর পলিতে গঠিত নিচু সমভূমি ও চরাঞ্চল। অন্যদিকে পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাংশে রয়েছে মধুপুর গড়ের লালমাটির উঁচু ভূমি ও শালবন — মধুপুর, ঘাটাইল ও সখিপুর উপজেলার বড় অংশ এই গড় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
জেলার প্রধান নদ-নদী:
- যমুনা
- ধলেশ্বরী
- ঝিনাই
- বংশী
- লৌহজং
- তুরাগ
প্রশাসনিক কাঠামো
টাঙ্গাইল জেলা ১২টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। প্রতিটি উপজেলা একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত, আর জেলা শহরসহ বেশিরভাগ উপজেলা সদরে পৌরসভা রয়েছে।
উপজেলাসমূহ: টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, গোপালপুর, ঘাটাইল, দেলদুয়ার, ধনবাড়ী, নাগরপুর, বাসাইল, ভূঞাপুর, মধুপুর, মির্জাপুর ও সখিপুর।
জাতীয় সংসদের আসন
জেলায় জাতীয় সংসদের ৮টি আসন রয়েছে:
- টাঙ্গাইল-১: মধুপুর ও ধনবাড়ী
- টাঙ্গাইল-২: গোপালপুর ও ভূঞাপুর
- টাঙ্গাইল-৩: ঘাটাইল
- টাঙ্গাইল-৪: কালিহাতী
- টাঙ্গাইল-৫: টাঙ্গাইল সদর
- টাঙ্গাইল-৬: নাগরপুর ও দেলদুয়ার
- টাঙ্গাইল-৭: মির্জাপুর
- টাঙ্গাইল-৮: বাসাইল ও সখিপুর
অর্থনীতি
টাঙ্গাইলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, সরিষা, আখ, আলু, গম ও নানা ধরনের শাকসবজি জেলার প্রধান ফসল। মধুপুর গড় অঞ্চলের আনারস, কলা ও কাঁঠাল দেশজুড়ে পরিচিত।
কৃষির পাশাপাশি তাঁতশিল্প জেলার অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেলদুয়ারের পাথরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু পরিবার বংশপরম্পরায় তাঁত বোনার সঙ্গে যুক্ত।
ঢাকার কাছাকাছি অবস্থান এবং যমুনা সেতুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের কারণে জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও সেবা খাতের গুরুত্ব বাড়ছে। ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন শিল্পকারখানাও গড়ে উঠেছে।
ঐতিহ্য
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি
হাতে বোনা টাঙ্গাইল শাড়ি সূক্ষ্ম বুনন ও নকশার জন্য দেশ-বিদেশে সমাদৃত। ঐতিহ্যগতভাবে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরা এই শাড়ি বুননের জন্য পরিচিত। ২০২৪ সালে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ডিসেম্বর ২০২৫-এ "টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি বুননশিল্প" ইউনেস্কোর মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিস্তারিত পড়ুন
পোড়াবাড়ির চমচম
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী এলাকার চমচম দেশের অন্যতম বিখ্যাত মিষ্টি। পোড়াবাড়ির চমচমও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত। বিস্তারিত পড়ুন
টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য
অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত টাঙ্গাইলের চারটি পণ্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে নিবন্ধিত — সবগুলোর আবেদনকারী জেলা প্রশাসক, টাঙ্গাইল:
- টাঙ্গাইল শাড়ি (২০২৪)
- পোড়াবাড়ির চমচম (২০২৪)
- মধুপুরের আনারস (২০২৪)
- জামুর্কির সন্দেশ (২০২৫)
কাঁসা-পিতল, নারান্দিয়ার মুড়ি ও ইন্দুটির দইয়ের জিআই আবেদন প্রক্রিয়াধীন।
আরও যা পরিচিত
- মধুপুর অঞ্চলের গারো (মান্দি) জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি
- আতিয়া মসজিদ, ধনবাড়ী মসজিদসহ প্রাচীন স্থাপত্য
- করটিয়া, মহেড়া, পাকুটিয়া ও হেমনগরের জমিদার বাড়ি
শিক্ষা
টাঙ্গাইলে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসাশিক্ষা ও মাধ্যমিক শিক্ষার বেশ কিছু খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ
- টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ
- কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, মির্জাপুর
- সরকারি সা'দত কলেজ, করটিয়া (প্রতিষ্ঠা ১৯২৬)
- সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ, কাগমারী (প্রতিষ্ঠা ১৯৫৭)
- মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ
- ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর
- বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল শহর
আরও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাবেন প্রতিষ্ঠান ডিরেক্টরিতে।
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব
টাঙ্গাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি:
- মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী — রাজনীতিবিদ, টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁর সমাধি অবস্থিত
- বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী — বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, জন্ম কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ীতে
- নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী — ধনবাড়ীর নওয়াব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য স্মরণীয়
- ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) — করটিয়ার জমিদার ও শিক্ষানুরাগী, সা'দত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা
- রণদাপ্রসাদ সাহা — দানবীর, কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমসের প্রতিষ্ঠাতা
- প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ — শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক
- রফিক আজাদ — কবি, জন্ম ঘাটাইল উপজেলায়
- পি. সি. সরকার — বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী, জন্ম টাঙ্গাইলে
তথ্যগুলো বিভিন্ন উন্মুক্ত সূত্র থেকে সংকলিত; ভুল পেলে আমাদের জানান।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
টাঙ্গাইল সম্পর্কে আরও পড়ুন
টাঙ্গাইল জেলা: সাধারণ প্রশ্ন
টাঙ্গাইল জেলা কোথায় অবস্থিত?
টাঙ্গাইল বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে, যমুনা নদীর পূর্ব তীরে ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। উত্তরে জামালপুর, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর, পশ্চিমে যমুনা নদী ও সিরাজগঞ্জ, দক্ষিণে মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলা (বিবিএস জেলা রিপোর্ট)।
টাঙ্গাইল কোন বিভাগে? টাঙ্গাইল কি ঢাকা জেলার অংশ?
টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের একটি আলাদা জেলা — ঢাকা জেলার অংশ নয়। আয়তনে এটি ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা।
টাঙ্গাইল কবে জেলা হয়?
১৯৬৯ সালে। এর আগে টাঙ্গাইল ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা (বিবিএস জেলা রিপোর্ট)।
টাঙ্গাইলকে কেন উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলা হয়?
ঢাকা থেকে যমুনা সেতু হয়ে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার সড়ক ও রেলপথ টাঙ্গাইলের ওপর দিয়েই গেছে — তাই জেলাটিকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলা হয়।
ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের দূরত্ব কত?
রেলপথে ঢাকার কমলাপুর থেকে টাঙ্গাইল স্টেশন ৯৭ কিলোমিটার (বাংলাদেশ রেলওয়ের ভাড়া তালিকার দূরত্ব)। সড়কপথ ও যাতায়াতের উপায় দেখুন "ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল" গাইডে।
টাঙ্গাইল জেলার থানা কয়টি ও কী কী?
১৩টি: টাঙ্গাইল মডেল থানা, দেলদুয়ার থানা, নাগরপুর থানা, মির্জাপুর থানা, বাসাইল থানা, সখিপুর থানা, কালিহাতী থানা, ঘাটাইল থানা, মধুপুর থানা, ধনবাড়ী থানা, গোপালপুর থানা, ভূঞাপুর থানা, যমুনা সেতু পূর্ব থানা।
টাঙ্গাইল জেলার সংসদীয় আসন কয়টি ও কী কী?
৮টি: টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর ও ধনবাড়ী); টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর ও ভূঞাপুর); টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল); টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী); টাঙ্গাইল-৫ (টাঙ্গাইল সদর); টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর ও দেলদুয়ার); টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর); টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল ও সখিপুর)।
টাঙ্গাইলে কয়টি পৌরসভা ও ইউনিয়ন?
১১টি পৌরসভা ও ১২০টি ইউনিয়ন পরিষদ (বিবিএস জেলা রিপোর্ট)।
টাঙ্গাইল জেলায় কয়টি উপজেলা?
টাঙ্গাইল জেলায় ১২টি উপজেলা: টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, গোপালপুর, ঘাটাইল, দেলদুয়ার, ধনবাড়ী, নাগরপুর, বাসাইল, ভূঞাপুর, মধুপুর, মির্জাপুর, সখিপুর।
টাঙ্গাইল জেলার আয়তন ও জনসংখ্যা কত?
আয়তন প্রায় ৩,৪১৪.২৮ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ৪০,৩৭,৬০৮ (সূত্র: জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ (বিবিএস) থেকে সংকলিত — যাচাই বাকি)।
টাঙ্গাইল কী জন্য বিখ্যাত?
টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি (ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য), পোড়াবাড়ির চমচম, মধুপুরের শালবন, আতিয়া মসজিদ, ধনবাড়ী নবাব মঞ্জিল ও যমুনা নদীর জন্য পরিচিত।