
কাগমারী সম্মেলন হয় ৬–১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, টাঙ্গাইলের কাগমারীতে, মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি, আসসালামু আলাইকুম ও ন্যাপ গঠনের পটভূমি।
কাগমারী সম্মেলন হয়েছিল ১৯৫৭ সালের ৬ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি, টাঙ্গাইল সদরের কাগমারীতে। এটি ছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন, আর তার সঙ্গে একটি বড় সাংস্কৃতিক সম্মেলনও আয়োজন করা হয়। সভাপতিত্ব করেন দলের তৎকালীন সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির দাবি প্রকাশ্যে জোরালোভাবে ওঠে। এই প্রশ্নে দলে যে বিভাজন তৈরি হয়, তার ধারাবাহিকতায় একই বছর ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন।
এক নজরে কাগমারী সম্মেলন
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সময় | ৬–১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ (বাংলাপিডিয়া) |
| স্থান | কাগমারী, টাঙ্গাইল সদর (সন্তোষের কাছে) |
| সভাপতি | মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী |
| ধরন | আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন |
| মূল আলোচ্য | পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি |
| বিতর্কের কেন্দ্র | সিয়াটো ও সেন্টো সামরিক জোটে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ |
| পরিণতি | দলে বিভাজন, ১৮ মার্চ ১৯৫৭ ভাসানীর পদত্যাগ, জুলাই ১৯৫৭-তে ন্যাপ গঠন |
পটভূমি: যুক্তফ্রন্টের প্রতিশ্রুতি বনাম ক্ষমতার রাজনীতি
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা কর্মসূচি নিয়ে মুসলিম লীগকে হারায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ছিল সেই ২১ দফার একটি অঙ্গীকার।
কয়েক বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ কেন্দ্র ও প্রদেশ দুই জায়গাতেই সরকারে আসে। দলের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সিয়াটো ও সেন্টো সামরিক চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকেও তিনি সমর্থন করেন।
দলের সভাপতি ভাসানী এই অবস্থানের বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, এটি দলের ঘোষিত নীতি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। এই মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় কাগমারীতে।
কেন কাগমারী
কাগমারী টাঙ্গাইল শহরের কাছে, সন্তোষ এলাকার পাশে অবস্থিত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকটি পরিচয়:
- পরগনা: বাসাইল উপজেলার পোর্টাল অনুযায়ী মোগল আমলে "কাগমারী" নামে একটি পরগনা ছিল, যা ১৭২২ সালের রাজস্ব বন্দোবস্তে ঘোড়াঘাট চাকলার অধীনে যায়।
- সম্মেলনের মাঠ: দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশভাগের পর অব্যবহৃত পড়ে থাকা সন্তোষের মহারাজার পুরোনো এস্টেটের জমিতে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।
- ভাসানীর কর্মস্থল: সন্তোষ ছিল মওলানা ভাসানী-র কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র।
- কারুশিল্প: কাগমারী নামটি এ অঞ্চলের কাঁসা-পিতল শিল্প-এর জন্যও সুপরিচিত।
ডেইলি স্টারের ওই লেখায় আরও বলা হয়েছে, সম্মেলন উপলক্ষে গ্রামটিতে রাস্তা, বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার ও রান্নার ব্যবস্থা করা হয়। বিপুল জনসমাগম সামলাতেই এসব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
সম্মেলনে কী হয়েছিল
কাউন্সিল অধিবেশন
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ৭ ফেব্রুয়ারির কাউন্সিল অধিবেশনের প্রধান আলোচ্য ছিল দুটি:
- পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন।
- দলের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি।
ভাসানী দলীয় নেতা ও পরিষদ সদস্যদের সামনেই সামরিক চুক্তির কড়া সমালোচনা করেন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে অনড় থাকেন। দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় পদে থেকেই মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন, যা দলের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়।
সাংস্কৃতিক সম্মেলন ও জনসমাগম
রাজনৈতিক অধিবেশনের পাশাপাশি কাগমারীতে একটি বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন চলে। একে কেউ মেলা, কেউ সাংস্কৃতিক সম্মেলন, আবার কেউ "আফ্রো-এশীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন" বলেছেন। ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
- কাদের ডাকা হয়েছিল: ভাসানী সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে আসার আহ্বান জানান, যেমন কৃষক, শ্রমিক, কামার ও কুমার।
- কারা এসেছিলেন: হাজারো মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, বিদেশি অতিথি ও কূটনীতিকেরাও উপস্থিত ছিলেন।
- তোরণ: সম্মেলনস্থলে প্রায় ৫০টি, সম্ভবত তারও বেশি সাজানো তোরণ তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো দেশ-বিদেশের নানা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নামে, যেমন গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও মাও সে-তুং। লেখকের ধারণা, তোরণগুলোর পরিকল্পনায় শিল্পী কামরুল হাসানের হাত ছিল। নামগুলো কোনো ক্রমানুসারে সাজানো হয়নি।
"আসসালামু আলাইকুম"
কাগমারী সম্মেলনের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত মুহূর্ত ভাসানীর একটি সতর্কবার্তা।
- বক্তব্যের সারকথা: পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্য চলতে থাকলে এ অঞ্চলের মানুষ একদিন পশ্চিম পাকিস্তানকে "আসসালামু আলাইকুম" জানিয়ে বিদায় নিতে বাধ্য হবে।
- যেসব সূত্রে আছে: জেলা প্রশাসনের পোর্টাল, প্রথম আলোর একটি স্মৃতিচারণমূলক কলাম এবং দ্য ডেইলি স্টার বাংলার একটি প্রবন্ধে এর উল্লেখ আছে।
- সীমাবদ্ধতা: বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে এই বাক্যটির উল্লেখ নেই। বক্তব্যের হুবহু শব্দ নিয়েও বিভিন্ন লেখায় সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।
তাৎপর্য ও পরিণতি
কাগমারী সম্মেলনের পর আওয়ামী লীগের ভেতরের মতাদর্শিক বিভাজন আর লুকানো থাকেনি। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, শেখ মুজিবুর রহমানসহ ডানপন্থী অংশ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব ও নীতির পক্ষে থাকে, আর বামপন্থী অংশ ভাসানীকে সমর্থন করে। এরপর ঘটনাগুলো দ্রুত এগোয়:
- ১৮ মার্চ ১৯৫৭: ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
- ২৪–২৫ জুলাই ১৯৫৭: ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে সম্মেলন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়। ভাসানী হন এর সভাপতি।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই সম্মেলনের গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে:
- স্বায়ত্তশাসনের দাবি: পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি এখানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়।
- পররাষ্ট্রনীতি: সামরিক জোটবিরোধী, জোটনিরপেক্ষ নীতির প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে আসে।
- রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন: কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষকে একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মঞ্চে আনার চেষ্টা হয়।
অনেক লেখক ও বিশ্লেষক পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কাগমারী সম্মেলনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখেন। তবে এর মূল্যায়ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিভেদে আলাদা হতে পারে।
তারিখ নিয়ে ভিন্নতা
বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি) ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাংলাপিডিয়া নিবন্ধে সম্মেলনের সময় ৬–১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭। কিছু লেখায় শুধু কাউন্সিল অধিবেশনের দিন হিসেবে ৭–৮ ফেব্রুয়ারি দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও সাংস্কৃতিক সম্মেলনের সময় ৮–১০ ফেব্রুয়ারি বলা হয়েছে। ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণে আয়োজনটি ছয় দিনের বলা হয়েছে। মূলত পুরো আয়োজন আর তার আলাদা অংশগুলোর সময় মিলিয়ে ফেলার কারণেই এই পার্থক্য দেখা যায়।
আজকের কাগমারী ও সন্তোষ
১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যু হয়। তাঁকে সন্তোষে সমাহিত করা হয়, আর সেখানকার মাজার এখন টাঙ্গাইলের পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। সন্তোষেই অবস্থিত মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। কাগমারী সম্মেলনের স্মৃতি তাই টাঙ্গাইল সদরের এই এলাকার পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে।
টাঙ্গাইলের সামগ্রিক ইতিহাস ও বিশিষ্ট মানুষদের কথা জানতে দেখুন জেলা পরিচিতি, টাঙ্গাইল সদর উপজেলা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
তথ্যসূত্র
- Banglapedia — Kagmari Conference — প্রবেশ 2026-10-16
- Banglapedia — Tangail Sadar Upazila — প্রবেশ 2026-10-16
- Banglapedia — National Awami Party — প্রবেশ 2026-10-16
- Banglapedia — Bhasani, Maulana Abdul Hamid Khan — প্রবেশ 2026-10-16
- The Daily Star — 'We are the 95%': Bhashani and the Kagmari Festival — প্রবেশ 2026-10-16
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা — জনতার হৃদয়ে আপসহীন ভাসানী — প্রবেশ 2026-10-16
- প্রথম আলো — কাছে থেকে দেখা মওলানা ভাসানী — প্রবেশ 2026-10-16
- টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব — প্রবেশ 2026-10-16
- বাসাইল উপজেলা তথ্য বাতায়ন — পটভূমি ও ঐতিহ্য — প্রবেশ 2026-10-16
- টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — এক নজরে জেলা — প্রবেশ 2026-10-16
- Wikipedia — Kagmari Conference (মিলিয়ে দেখার জন্য) — প্রবেশ 2026-10-16
সাধারণ প্রশ্ন
কাগমারী সম্মেলন কবে হয়েছিল?
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কাগমারী সম্মেলন হয়েছিল ১৯৫৭ সালের ৬ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে ৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে মূল রাজনৈতিক আলোচনা হয়।
কাগমারী সম্মেলন কোথায় হয়েছিল?
সম্মেলনটি হয়েছিল টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাগমারীতে, সন্তোষ এলাকার কাছে। ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী জায়গাটি ছিল সন্তোষের মহারাজার পুরোনো এস্টেটের অংশ।
কাগমারী সম্মেলনের আয়োজক কে ছিলেন?
সম্মেলনটি ছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের তৎকালীন সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
কাগমারী সম্মেলনে "আসসালামু আলাইকুম" বলা হয়েছিল কেন?
বহুল প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ভাসানী সতর্ক করেছিলেন যে বৈষম্য চলতে থাকলে পূর্ব বাংলা একদিন পশ্চিম পাকিস্তানকে "আসসালামু আলাইকুম" বলে বিদায় জানাবে। কথাটি স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়, যদিও বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে এর উল্লেখ নেই।
কাগমারী সম্মেলনের ফলাফল কী হয়েছিল?
সামরিক চুক্তি ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে আওয়ামী লীগে বিভাজন দেখা দেয়। ভাসানী ১৯৫৭ সালের ১৮ মার্চ দলের সভাপতি পদ ছাড়েন এবং জুলাইয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন।
মূল সূত্র: Banglapedia — Kagmari Conference
কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের জানান — আমরা স্বচ্ছভাবে সংশোধন করি। সম্পাদকীয় নীতি