মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ

টাঙ্গাইলের ভৌগোলিক পরিচিতি: অবস্থান, সীমানা, আয়তন, জনসংখ্যা, জলবায়ু ও মাটি

ভূগোল ও প্রকৃতি ৭ মিনিটে পড়ুন

বাসাইলের বাশুলিয়ায় সরিষা খেত
বাসাইলের বাশুলিয়ায় সরিষা খেত · ছবি: Robinmkhan 1911 · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের যমুনাতীরের জেলা; আয়তন প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিমি, ২০২২ সালে জনসংখ্যা ৪০,৩৭,৬০৮। সীমানা, মধুপুর গড়ের লালমাটি ও যমুনার চরের পরিচয়।

টাঙ্গাইল বাংলাদেশের মধ্যভাগে, ঢাকা বিভাগে যমুনা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত একটি জেলা। এর উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এবং পশ্চিমে যমুনার ওপারে সিরাজগঞ্জ। জেলার আয়তন প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিলোমিটার, আর ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানে গণনাকৃত মানুষের সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৮। ভূপ্রকৃতিতে জেলাটি দুই ভাগে বিভক্ত: পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে মধুপুর গড়ের উঁচু লালমাটি, আর পশ্চিমে যমুনার নিচু প্লাবনভূমি ও চর।

অবস্থান ও দূরত্ব

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল শহরের দূরত্ব জেলা তথ্য বাতায়নের হিসাবে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলাটি মোটামুটি ২৪°০১′ থেকে ২৪°৪৭′ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°৪৪′ থেকে ৯০°১৮′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে বিস্তৃত। জেলার এক প্রান্ত যমুনার তীরে, আর অন্য প্রান্তে মধুপুর গড়ের শালবন। জেলা তথ্য বাতায়ন টাঙ্গাইলকে "উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার" হিসেবে পরিচয় দিয়েছে; যমুনা সেতুমুখী মহাসড়ক ও রেলপথ এই জেলার ভেতর দিয়েই গেছে।

চতুর্সীমা: কোন দিকে কোন জেলা

দিকপ্রতিবেশী জেলা
উত্তরজামালপুর
দক্ষিণঢাকা ও মানিকগঞ্জ
পূর্বময়মনসিংহ ও গাজীপুর
পশ্চিমসিরাজগঞ্জ (মাঝখানে যমুনা নদী)

পশ্চিম দিকের সীমানাটি প্রাকৃতিক, কারণ যমুনাই টাঙ্গাইল আর সিরাজগঞ্জকে আলাদা করেছে। এই সীমানায় এখন যমুনা সেতু ও যমুনা রেলসেতু দুই জেলাকে জুড়ে দিয়েছে।

আয়তন: কোন সংখ্যাটি ঠিক?

টাঙ্গাইলের আয়তন নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে সামান্য ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়:

  • জেলা তথ্য বাতায়নের "এক নজরে জেলা" পাতা: ৩,৪১৩.৬৮ বর্গকিমি
  • বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ২০২২-এর জেলা প্রতিবেদনভিত্তিক হিসাব: ৩,৪১৪.২৮ বর্গকিমি
  • বাংলাপিডিয়া: ৩,৪১৪.৩৫ বর্গকিমি

এর বাইরে বাতায়নেরই "ভৌগোলিক পরিচিতি" পাতায় ৩,৪২৪.৩৮ এবং আরেক অংশে ৩,৩৭৫ বর্গকিমি লেখা আছে, যেগুলো অন্য সূত্রের সঙ্গে মেলে না। তাই "প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিলোমিটার" বলাই সবচেয়ে নিরাপদ। আয়তনে টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা। জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে বাংলাপিডিয়ার হিসাবে আয়তনে সবচেয়ে বড় ঘাটাইল (প্রায় ৪৫১ বর্গকিমি) আর সবচেয়ে ছোট ধনবাড়ী (প্রায় ১৩৪ বর্গকিমি)।

জনসংখ্যা: জনশুমারি ২০২২

বিষয়তথ্য
গণনাকৃত জনসংখ্যা৪০,৩৭,৬০৮ জন
গণনার ঘাটতি সমন্বয়ের পর আনুমানিক জনসংখ্যা৪১,৬৮,০৮৩ জন
পুরুষ১৯,৪৫,০০২ জন
নারী২০,৯০,৯৮২ জন
জনঘনত্বপ্রতি বর্গকিমিতে প্রায় ১,১৮২ জন
সাক্ষরতার হার (৭ বছর ও তদূর্ধ্ব)৬৯.৬২% (জেলা বাতায়ন) / ৬৯.৭৫% (পরিসংখ্যান ব্যুরোর জেলা প্রতিবেদনভিত্তিক হিসাব)

গণনাকৃত সংখ্যাটি জেলা তথ্য বাতায়নের ২০২৬ সালের হালনাগাদ থেকে নেওয়া। জনশুমারিতে কিছু মানুষ বাদ পড়ে যান বলে পরিসংখ্যান ব্যুরো শুমারি-পরবর্তী যাচাইয়ের ভিত্তিতে একটি সমন্বয় হার দেয়; সেই হার প্রয়োগ করলে জেলার জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪১ লাখ ৬৮ হাজার। পরিসংখ্যান ব্যুরোর বয়সভিত্তিক টেবিলে মোট সংখ্যা ৪০,৩৭,৩১৬ দেখানো আছে — সামান্য এই পার্থক্য ব্যুরোর নিজস্ব টেবিলগুলোর মধ্যেই।

উল্লেখযোগ্য দিক হলো, টাঙ্গাইলে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি; প্রতি হাজার পুরুষের বিপরীতে নারী প্রায় ১,০৭৫ জন। ধর্মভিত্তিক হিসাবে মুসলিম ৯৩.১৭%, হিন্দু ৬.৩৬%, খ্রিষ্টান ০.৩৮% এবং বৌদ্ধ ও অন্যান্য মিলিয়ে এক শতাংশের অনেক কম। মধুপুর অঞ্চলে গারো, কোচ, বর্মণ, হাজংসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস।

প্রশাসনিকভাবে জেলায় ১২টি উপজেলা, ১১টি পৌরসভা ও ১২০টি ইউনিয়ন রয়েছে; সিটি করপোরেশন নেই। জেলা বাতায়ন গ্রামের সংখ্যা ২,৫১৬ বলে উল্লেখ করেছে। উপজেলা ও ইউনিয়নের পূর্ণ তালিকা আছে টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলা ও ১২০ ইউনিয়ন পাতায়।

ভূপ্রকৃতি: লালমাটির গড় আর যমুনার চর

মধুপুর গড়

জেলার পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিকের উঁচু এলাকা — মধুপুর, ঘাটাইল, সখিপুর ও মির্জাপুরের পাহাড়ি বা গড় অঞ্চল — মধুপুর গড় নামের একটি পুরোনো উঁচু ভূভাগের অংশ। বাংলাপিডিয়ার "মধুপুর গড়" নিবন্ধ অনুযায়ী এই ভূভাগ প্লাইস্টোসিন যুগের, আশপাশের প্লাবনভূমি থেকে মোটামুটি ১ থেকে ১০ মিটার উঁচু। এখানকার মাটি "মধুপুর কর্দম" নামে পরিচিত পুরোনো কাদামাটির ওপর গড়ে উঠেছে; রং লাল বা বাদামি, পুষ্টিগুণে তুলনামূলক দুর্বল এবং কিছুটা অম্লীয়। উঁচু অংশগুলোকে স্থানীয়ভাবে "চালা" আর মাঝের নিচু উপত্যকাগুলোকে "বাইদ" বলা হয়।

এই লালমাটির গড়েই শাল বা গজারির বন। একসময় শালই ছিল এখানকার প্রধান গাছ, কিন্তু বন উজাড়ের কারণে এর বড় অংশ হারিয়ে গেছে। জেলা বাতায়ন জেলার মোট বনভূমি ৫০৯.৮ বর্গকিমি বলে উল্লেখ করেছে, আর জনশুমারিভিত্তিক হিসাবে এটি ৪৯৭.২৭ বর্গকিমি। এই বনের সংরক্ষিত অংশ মধুপুর জাতীয় উদ্যান, আর ঘাটাইলের মাইধারচালা লাল পাহাড় এই লালমাটির ভূপ্রকৃতিরই একটি চোখে পড়ার মতো নমুনা।

যমুনার প্লাবনভূমি ও চর

জেলার পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ একেবারে ভিন্ন। যমুনা ও তার শাখানদীগুলোর বয়ে আনা পলিতে গড়া এই সমতল ভূমি নিচু, বর্ষায় সহজেই প্লাবিত হয়। ভূঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুরের যমুনাতীরে অসংখ্য চর জেগে ওঠে আবার ভেঙে যায়। জেলা বাতায়নের বর্ণনায় টাঙ্গাইলকে মধুপুর অঞ্চলের উঁচু ভূমির দক্ষিণে যমুনার কাছের নিচু প্লাবনভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা বলা হয়েছে প্রায় ১৪ মিটার।

বাংলাপিডিয়ার উপজেলাভিত্তিক তথ্যে এসব এলাকার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, সরিষা, গম, আলু ও আখের নাম এসেছে। নতুন পলিতে জমি উর্বর হলেও নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি এই অংশেই সবচেয়ে বেশি। জেলার সামগ্রিক পরিচয়ের জন্য দেখুন টাঙ্গাইল জেলা পরিচিতি।

নদী ও জলাভূমি

যমুনা, ধলেশ্বরী, ঝিনাই, বংশী (বংশাই), লৌহজং ও তুরাগ জেলার প্রধান নদী। টাঙ্গাইল শহর গড়ে উঠেছে লৌহজংয়ের তীরে। নদীর পাশাপাশি বাসাইলের বালিয়া, কাউলজানী, ডুবাইল ও চাপড়া বিলের মতো জলাভূমি এবং অসংখ্য খাল জেলার পানিসম্পদের বড় অংশ। চাপড়া বিল ঘিরে গড়ে ওঠা বাসুলিয়া এখন জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা।

জলবায়ু

টাঙ্গাইলের জলবায়ু ক্রান্তীয় ধরনের: গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও আর্দ্র, শীতকাল তুলনামূলক মৃদু। জেলা তথ্য বাতায়নের হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ২,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যার বড় অংশ ঝরে বর্ষাকালে। তখন যমুনা ও শাখানদীগুলোর পানি বেড়ে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট তাপমাত্রার গড় এই লেখার সূত্রে পাওয়া যায়নি, তাই এখানে তা দেওয়া হয়নি।

জীববৈচিত্র্য

শালবন, জলাভূমি, তৃণভূমি ও কৃষিজমি মিলিয়ে টাঙ্গাইলে বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাস। জেলা বাতায়নে উদ্ধৃত ২০১৯ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী মধুপুর জাতীয় উদ্যানে ১৭৬ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে শাল, কদম, কড়ই ও জাম প্রধান। একই সূত্রে জেলার প্রাণিকুলে ২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪০ প্রজাতির পাখি ও ২৯ প্রজাতির সাপের কথা বলা হয়েছে। বন উজাড়, দখল ও দূষণের কারণে এই জীববৈচিত্র্য এখন চাপের মুখে।

তথ্যসূত্র

সাধারণ প্রশ্ন

টাঙ্গাইল জেলার আয়তন কত?

টাঙ্গাইলের আয়তন প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিলোমিটার। জেলা তথ্য বাতায়ন ৩,৪১৩.৬৮ এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি-ভিত্তিক হিসাব ৩,৪১৪.২৮ বর্গকিমি দেখায়; দশমিকের পরের অঙ্কে সূত্রভেদে সামান্য পার্থক্য আছে।

টাঙ্গাইলের চারপাশে কোন কোন জেলা?

উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এবং পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ। পশ্চিমের সীমানা যমুনা নদী।

২০২২ সালের জনশুমারিতে টাঙ্গাইলের জনসংখ্যা কত?

জনশুমারি ২০২২-এ টাঙ্গাইলের গণনাকৃত জনসংখ্যা ৪০,৩৭,৬০৮ জন। গণনার ঘাটতি সমন্বয় করলে আনুমানিক জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৪১,৬৮,০৮৩ জন।

মধুপুর গড়ের মাটি লাল কেন?

মধুপুর গড় প্লাইস্টোসিন যুগের পুরোনো উঁচু ভূমি, যার মাটি "মধুপুর কর্দম" নামের পুরোনো কাদামাটি থেকে তৈরি। এই মাটির রং লাল বা বাদামি এবং আশপাশের নতুন পলিমাটির প্লাবনভূমি থেকে এটি স্পষ্টভাবে আলাদা।

টাঙ্গাইল কি ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা?

হ্যাঁ, আয়তনের দিক থেকে টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা। এর আয়তন প্রায় ৩,৪১৪ বর্গকিলোমিটার।

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল কত দূরে?

জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। যাতায়াতের উপায় জানতে দেখুন ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল যাওয়ার উপায়।

মূল সূত্র: টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — এক নজরে জেলা (হালনাগাদ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের জানান — আমরা স্বচ্ছভাবে সংশোধন করি। সম্পাদকীয় নীতি