
পোড়াবাড়ির চমচম, জামুর্কির সন্দেশ, মধুপুরের আনারস, ইন্দুটির দই, নারান্দিয়ার মুড়ি আর দই-ক্ষীর-ঘি—টাঙ্গাইলের খাবারের ইতিহাস ও জিআই অবস্থা।
টাঙ্গাইলের খাবারের পরিচয় মূলত তার মিষ্টি আর দুধের খাবারে: পোড়াবাড়ির চমচম, মির্জাপুরের জামুর্কির সন্দেশ, কালিহাতীর ইন্দুটির দই ও নারান্দিয়ার হাতে ভাজা মুড়ি, সঙ্গে নানা এলাকার দই, ক্ষীর, ঘি ও মাখন। কৃষিপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাত মধুপুর গড়ের আনারস। এর মধ্যে চমচম, জামুর্কির সন্দেশ ও মধুপুরের আনারস ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
জেলা পোর্টালে উদ্ধৃত একটি প্রচলিত প্রবাদেই টাঙ্গাইলের খাদ্য-পরিচয়ের সারকথা আছে: "চমচম, টমটম ও শাড়ি, এই তিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি।"
এক নজরে: জিআই স্বীকৃতির অবস্থা
| খাবার | এলাকা | জিআই অবস্থা |
|---|---|---|
| পোড়াবাড়ির চমচম | টাঙ্গাইল সদর | স্বীকৃত; ঘোষণা আসে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি |
| মধুপুরের আনারস | মধুপুর | স্বীকৃত; সনদ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ (জিআই-৫২) |
| জামুর্কির সন্দেশ | মির্জাপুর | স্বীকৃত; সনদ হস্তান্তর ৩০ এপ্রিল ২০২৫ |
| নারান্দিয়ার মুড়ি | কালিহাতী | আবেদন প্রক্রিয়াধীন (জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী) |
| ইন্দুটির দই | কালিহাতী | আবেদন প্রক্রিয়াধীন (জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী) |
টাঙ্গাইল শাড়ি ও কাঁসা-পিতল খাদ্যপণ্য নয়, তবে জিআই তালিকায় সেগুলোও আছে। পুরো তালিকা দেখুন টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য গাইডে।
পোড়াবাড়ির চমচম
টাঙ্গাইলের মিষ্টির কথা উঠলে প্রথমেই আসে পোড়াবাড়ির চমচম। পোড়াবাড়ী টাঙ্গাইল সদর উপজেলার একটি এলাকা, যা একসময় ধলেশ্বরী নদীর তীরে ব্যস্ত নৌবন্দর ছিল বলে জেলা পোর্টাল জানায়।
উৎপত্তির গল্প: জেলা পোর্টাল ও জেলা প্রশাসনের জিআই নথি—দুটোতেই চমচমের বয়স প্রায় দুশো বছর বলা হয়েছে। গবেষকদের বরাতে প্রচলিত কাহিনি হলো, ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে দশরথ গৌড় নামে এক কারিগর পোড়াবাড়িতে এসে নদীর পানি আর স্থানীয় গরুর দুধ দিয়ে প্রথম এই চমচম বানান। পোর্টালে তাঁর পরের প্রজন্মের কয়েকজন কারিগরের নামও আছে—রাজারাম গৌড়, শিবশংকর গৌড়, মদন গৌড় প্রমুখ।
কেমন দেখতে, কী দিয়ে তৈরি: লম্বাটে গড়ন, বাইরে গাঢ় লালচে-বাদামি রং—দূর থেকে পোড়া ইটের মতো লাগে; ওপরে চিনির গুঁড়ার আবরণ, আর ভেতরটা নরম ও রসে ভরা। জিআই নথি অনুযায়ী প্রধান উপকরণ দুধের ছানা, ময়দা ও চিনি; পোর্টাল এর সঙ্গে এলাচের কথাও বলেছে। নথির ব্যাখ্যায়, হালকা আঁচে পোড় খাওয়ার ফলেই এর রং গাঢ় বাদামি হয়।
পানির রহস্য: স্থানীয়ভাবে বহুল প্রচলিত বিশ্বাস হলো, চমচমের আসল স্বাদ টাঙ্গাইলের পানির গুণে; অন্য জেলায় পোড়াবাড়ির কারিগর নিয়ে গিয়েও একই স্বাদ পাওয়া যায়নি বলে পোর্টালে দাবি করা হয়েছে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা তথ্য নয়, লোকবিশ্বাস হিসেবেই পড়া উচিত।
উত্থান ও ভাটা: নৌবন্দর জমজমাট থাকার সময় পোড়াবাড়িতে বহু চমচম কারখানা গড়ে উঠেছিল। পরে ধলেশ্বরীতে চর পড়ে নৌপথ বন্ধ হলে বাজারটি জৌলুস হারায় এবং কারিগরদের অনেকে পেশা বদলান—জেলা পোর্টালের বিবরণে এমনটাই আছে। এখন টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজারসহ জেলার নানা জায়গায় চমচম তৈরি ও বিক্রি হয়।
জিআই: জেলা প্রশাসনের আবেদনের ভিত্তিতে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর পোড়াবাড়ির চমচমকে জিআই হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; প্রথম আলো ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি খবরটি প্রকাশ করে।
জামুর্কির সন্দেশ
মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কির সন্দেশ স্থানীয়ভাবে "কালিদাসের সন্দেশ" নামেও পরিচিত। জেলা প্রশাসনের জিআই নথি অনুযায়ী জামুর্কি গ্রামের কালিদাস চন্দ্র সাহা ১৯৪০ সালে চিনি ও পাটালি গুড়—এই দুই ধরনের সন্দেশ বানিয়ে বিক্রি শুরু করেন, আর ধীরে ধীরে তার সুনাম আশপাশে ছড়ায়। দ্য ডেইলি স্টারের একটি ফিচার জানায়, বাবা মদনমোহন সাহার পর তিনি পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন এবং আশির দশকে মারা যান; উপকরণ হিসেবে খাঁটি দুধ, চিনি ও পাটালি গুড়ের কথা বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন এই সন্দেশের জিআই আবেদন করে ২০২৪ সালে, আর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসে সনদ হস্তান্তর করা হয়। বিস্তারিত: জামুর্কির সন্দেশ।
মধুপুরের আনারস
মধুপুর গড়ের লালমাটিতে ফলা আনারস টাঙ্গাইলের সবচেয়ে পরিচিত কৃষিপণ্য। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এটি জিআই-৫২ নম্বরে সনদ পায়।
- জাত: সবচেয়ে বেশি চাষ হয় জায়ান্ট কিউ জাতের, যা স্থানীয় চাষিদের কাছে "ক্যালেন্ডার" নামে পরিচিত। এ ছাড়া হানি কুইন (স্থানীয় নাম জলডুগি), আশ্বিনা ও এমডি-২ জাতেরও চাষ হয়।
- এলাকা: জিআই নথি অনুযায়ী মধুপুরের অরণখোলা, শোলাকুড়ি ও আউশনারা ইউনিয়নে আনারস চাষ সবচেয়ে বেশি।
- শুরুর গল্প: গারো সম্প্রদায়ের হাত ধরে মেঘালয় থেকে চারা এনে মধুপুরে আনারস চাষ শুরু হয়। কে, কবে শুরু করেছিলেন তা নিয়ে সূত্রভেদ আছে: জিআই নথিতে ভেরেনো সাংমা ও ষাটের দশক, ডেইলি স্টারে মিধি দয়াময়ী সাংমা ও ১৯৪২ সাল।
- হাট: আনারস কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র জলছত্র আনারসের হাট।
দেখুন মধুপুরের আনারস।
দই, ক্ষীর, ঘি ও মাখন
দুধের খাবারে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য পুরোনো। জেলা পোর্টাল কয়েকটি এলাকাকে এ জন্য আলাদা করে উল্লেখ করেছে:
- কালিহাতী: নরদই, দেউপুর, নিচনপুর ও এলেঙ্গা
- ভূঞাপুর: ফলদা ও উপজেলা সদর
- গোপালপুর: আলমনগর ও নলিন বাজার
পোর্টালের ভাষ্যে টাঙ্গাইলের ঘোষেরা দানাদার, দই ও ঘি তৈরি করেন, আর এখানকার দই স্বাদ-গন্ধে বগুড়ার দইয়ের সঙ্গে তুলনীয়। বিস্তারিত: দই, ক্ষীর, ঘি ও মাখন।
ইন্দুটির দই
কালিহাতী উপজেলার ইন্দুটির দই জেলার পরিচিত দুগ্ধপণ্য। জেলা প্রশাসনের জিআই নথিতে ইন্দুটিসহ টাঙ্গাইলের ঘোষদের দই তৈরির ধাপ বর্ণনা করা হয়েছে: বড় চুলায় কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে তা মাটির হাঁড়িতে ঢালা হয়, হাঁড়ির নিচে পাটের ছালা বা চট দেওয়া থাকে, রাতে ঢেকে রাখার পর সকালে জমাট দই পাওয়া যায়, আর সেদিনই তা হাটে ওঠে। নথি অনুযায়ী এর জিআই নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়াধীন। দেখুন ইন্দুটির দই।
নারান্দিয়ার মুড়ি
কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়ন হাতে ভাজা মুড়ির জন্য পরিচিত। জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী নারান্দিয়া, মাইস্তা, নগরবাড়ী, দৌলতপুর, লুহুরিয়া ও সিংহটিয়াসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের কয়েকশ পরিবার মুড়ি ভাজে; এখানে হাতে ও যন্ত্রে—দুই পদ্ধতিতেই মুড়ি হয়, তবে নারান্দিয়ার শতাধিক বাড়িতে এখনো হাতে ভাজাই চলে। নথিতে বলা হয়েছে, এখানকার মুড়ি টাঙ্গাইলসহ দেশের আটটি জেলায় যায় এবং মোদক সম্প্রদায় বিশেষভাবে এ পেশায় যুক্ত। জিআই আবেদন প্রক্রিয়াধীন। দেখুন নারান্দিয়ার মুড়ি।
আরও যত মিষ্টি
চমচম আর সন্দেশের বাইরেও টাঙ্গাইলে নানা মিষ্টি তৈরি হয়। জেলা পোর্টালের তালিকায় আছে দানাদার, রসগোল্লা, অমৃতি, জিলাপি, রসমালাই, কালোজাম, ক্ষীর, নানা রকম দই, খাজা, কদমা, বাতাসা, নই ও টানা।
- নলিন বাজারের রসগোল্লা এবং ফাইলা পাগলার মেলার কদমা-র আলাদা সুনামের কথা পোর্টালে আছে। দেখুন ফাইলা পাগলার মেলা।
- কারিগর সম্প্রদায়: পোর্টাল অনুযায়ী মিষ্টি তৈরিতে বংশানুক্রমে যুক্ত ঘোষ ও পাল সম্প্রদায়; কোথাও কোথাও দে ও নাগ পদবিধারীরাও আছেন। মোদক সম্প্রদায় গুড়, তেল ও ময়দা দিয়ে জিলাপি, কদমা, বাতাসা, গজা, খাজা, নই ও টানা বানান, আর চিনি বা গুড় দিয়ে খোরমা, মুড়ির মোয়া, খই ও নাড়ু।
২০২৬ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় মিষ্টি নিয়ে "সুইট ফেস্টিভাল" হয়েছিল বলে জেলা পোর্টালের ইভেন্ট তালিকায় দেখা যায়; আয়োজনটি প্রতিবছর হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। দেখুন সুইট ফেস্টিভ্যাল ও টাঙ্গাইলের অন্যান্য মিষ্টি।
তথ্যসূত্র
- টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — জেলার ঐতিহ্য — প্রবেশ 2026-10-16
- জেলা প্রশাসন টাঙ্গাইল — ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই নথি, PDF) — প্রবেশ 2026-10-16
- টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — এক নজরে জেলা — প্রবেশ 2026-10-16
- প্রথম আলো — পোড়াবাড়ির চমচমসহ চার পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেল (১ জানুয়ারি ২০২৪) — প্রবেশ 2026-10-16
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা — মধুপুরের আনারস জিআই সনদ পেল (২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪) — প্রবেশ 2026-10-16
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা — জামুর্কীর কালিদাসের সন্দেশের জিআই সনদ (৩০ এপ্রিল ২০২৫) — প্রবেশ 2026-10-16
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা — স্বাদে-গন্ধে মন মাতানো জামুর্কীর কালিদাসের সন্দেশ (২২ মার্চ ২০২৪) — প্রবেশ 2026-10-16
- বাসাইল উপজেলা তথ্য বাতায়ন — ফাইলা পাগলার মেলা — প্রবেশ 2026-10-16
সাধারণ প্রশ্ন
পোড়াবাড়ির চমচম কেন বিখ্যাত?
প্রায় দুশো বছরের ঐতিহ্য, গাঢ় লালচে-বাদামি রং, নরম রসালো ভেতর আর স্বতন্ত্র স্বাদের জন্য পোড়াবাড়ির চমচম দেশজুড়ে পরিচিত। ২০২৪ সালের শুরুতে এটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে।
পোড়াবাড়ী কোথায়?
পোড়াবাড়ী টাঙ্গাইল সদর উপজেলার একটি এলাকা। জেলা পোর্টাল অনুযায়ী একসময় এটি ধলেশ্বরী নদীর তীরে ব্যস্ত নৌবন্দর ছিল, আর সেই সময়েই এখানে চমচম তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
টাঙ্গাইলের কোন খাবারগুলো জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে?
এখন পর্যন্ত তিনটি খাদ্যপণ্য জিআই পেয়েছে: পোড়াবাড়ির চমচম (২০২৪), মধুপুরের আনারস (২০২৪) এবং জামুর্কির সন্দেশ (২০২৫)। নারান্দিয়ার মুড়ি ও ইন্দুটির দইয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন বলে জেলা প্রশাসনের নথিতে আছে।
জামুর্কির সন্দেশকে কালিদাসের সন্দেশ বলা হয় কেন?
জেলা প্রশাসনের জিআই নথি অনুযায়ী জামুর্কি গ্রামের কালিদাস চন্দ্র সাহা ১৯৪০ সালে চিনি ও পাটালি গুড়ের সন্দেশ বিক্রি শুরু করেন। তাঁর নাম থেকেই সন্দেশটি স্থানীয়ভাবে কালিদাসের সন্দেশ নামে পরিচিত।
মধুপুরের আনারসের প্রধান জাত কোনটি?
মধুপুরে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় জায়ান্ট কিউ জাতের আনারস, যাকে স্থানীয়রা "ক্যালেন্ডার" বলেন। হানি কুইন বা জলডুগি, আশ্বিনা ও এমডি-২ জাতেরও চাষ হয়।
মূল সূত্র: টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — জেলার ঐতিহ্য
কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের জানান — আমরা স্বচ্ছভাবে সংশোধন করি। সম্পাদকীয় নীতি