মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ

টাঙ্গাইলের খেলাধুলা: ঐতিহ্যবাহী খেলা, ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রীড়াবিদ

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ৬ মিনিটে পড়ুন

ঘাটাইলের সাগরদিঘিতে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড়
ঘাটাইলের সাগরদিঘিতে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় · ছবি: Muhammad Amdad Hossain · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, কাবাডি থেকে সন্তোষ ট্রফি ও কৃষ্ণা রাণী সরকার — টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী খেলা, জাতীয় সাফল্য, স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া সংস্থার পরিচয়।

টাঙ্গাইলের খেলাধুলার ঐতিহ্যে একদিকে আছে গ্রামবাংলার লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, কাবাডি (হা-ডু-ডু), ষাঁড়ের লড়াই ও ঘোড়দৌড়, অন্যদিকে আছে ফুটবল, কাবাডি ও ভলিবলে জাতীয় পর্যায়ের সাফল্য। ব্রিটিশ আমলে সন্তোষের মহারাজা স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরী ভারতীয় ফুটবল সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আর তাঁর নামেই ভারতের জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা "সন্তোষ ট্রফি"। এ যুগে গোপালপুরের মেয়ে কৃষ্ণা রাণী সরকার সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী বাংলাদেশ দলের অন্যতম তারকা।

ঐতিহ্যবাহী খেলা

বাংলাপিডিয়ার টাঙ্গাইল জেলা নিবন্ধে জেলার প্রচলিত খেলাধুলার একটি তালিকা আছে, যা ২০০৭ সালের জেলা ও উপজেলা সাংস্কৃতিক সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি। সেখানে নাম এসেছে:

  • লাঠিখেলা (লাঠিবাড়ি): লাঠি হাতে কসরত, আত্মরক্ষা ও কৌশলের প্রদর্শনী।
  • নৌকাবাইচ: বর্ষায় নদী ভরে উঠলে লম্বা সরু নৌকার দৌড়। যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং ও বংশীর মতো নদীবহুল জেলায় এটি লোকউৎসবেরও অংশ; জেলা তথ্য বাতায়ন নবান্ন, পৌষ সংক্রান্তি, বারুণী ও অষ্টমীর পাশাপাশি নৌকাবাইচকে টাঙ্গাইলের উল্লেখযোগ্য লোকউৎসব বলেছে।
  • কাবাডি: গ্রামবাংলায় হা-ডু-ডু নামে পরিচিত এই খেলায় টাঙ্গাইল জাতীয় পর্যায়েও সাফল্য পেয়েছে (নিচে বিস্তারিত)।
  • ষাঁড়ের লড়াই ও ঘোড়দৌড়: গ্রামীণ জনপদের পুরোনো প্রতিযোগিতা, যা বাংলাপিডিয়ার তালিকায় জায়গা পেয়েছে।
  • আরও কিছু স্থানীয় খেলা: বাংলাপিডিয়ার তালিকায় ভাড়া ভুঁডা, চঙ্গদৌড়, ঢোপবাড়ী, গামছাবাড়ী ও টুংকী বাড়ী নামের খেলারও উল্লেখ আছে। এগুলোর নিয়মকানুনের নির্ভরযোগ্য লিখিত বিবরণ আমরা পাইনি, তাই এখানে শুধু নাম দেওয়া হলো।

জেলা তথ্য বাতায়নের ঐতিহ্য-বিষয়ক লেখাতেও টাঙ্গাইলের লৌকিক খেলাধুলাকে লোক-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলা হয়েছে। নৌকাবাইচসহ জেলার লোকউৎসবগুলো নিয়ে আরও পড়ুন লোকউৎসব: নবান্ন, পৌষ সংক্রান্তি, বারুণী, অষ্টমী ও নৌকাবাইচ পাতায়।

জমিদার আমলের ফুটবল ঐতিহ্য

টাঙ্গাইলের আধুনিক খেলাধুলার ইতিহাসে জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা বড় ভূমিকা রেখেছিল। জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিবরণ অনুযায়ী সন্তোষ, নাগরপুর, মির্জাপুর ও হেমনগরের ক্রীড়ানুরাগী জমিদারেরা প্রতি বছর কলকাতা থেকে মোহামেডান, মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের মতো দল এনে খেলার আয়োজন করতেন। দেলদুয়ার, করটিয়া, মহেড়া ও পাকুটিয়ার জমিদারেরাও নিজেদের ফুটবল দল গড়েছিলেন।

  • সন্তোষ ট্রফি: সন্তোষের মহারাজা স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরী ছিলেন ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএ) সভাপতি। তাঁর নামে ১৯৪১ সালে চালু হওয়া "সন্তোষ ট্রফি" আজও ভারতের জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতা।
  • ইস্টবেঙ্গল ক্লাব: কলকাতার ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ১৯২০ সালের ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে সুরেশচন্দ্র চৌধুরী ও রাজা মন্মথনাথ চৌধুরীর নাম পাওয়া যায়; জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিবরণে ক্লাবটির জন্মের পেছনে সন্তোষ ও নাগরপুরের জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলা হয়েছে।

গ্রামেও ফুটবল ছিল প্রাণের খেলা। জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিবরণে আলিসাকান্দা, এলাসিন, এলেঙ্গা, ধুবুরিয়া, জামুর্কী, পাকুল্যা, ওয়ার্শী, ভূঞাপুর, গোপালপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল ও কালিহাতীকে একসময়ের ফুটবলকেন্দ্র বলা হয়েছে। সেই সময়ের কয়েকজন খেলোয়াড় কলকাতার বড় ক্লাবেও খেলেছেন — যেমন মির্জাপুরের ননী গোস্বামী, যিনি ইস্টবেঙ্গলের সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন।

জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য

জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে টাঙ্গাইলের উল্লেখযোগ্য সাফল্য:

খেলাসাফল্য
জাতীয় কাবাডি (পুরুষ)চ্যাম্পিয়ন ১৯৭৫, ১৯৭৭, ১৯৮১; রানার্সআপ ১৯৭৬, ১৯৭৮
জাতীয় ভলিবল (পুরুষ)চ্যাম্পিয়ন ১৯৭৬; রানার্সআপ ১৯৭৫, ১৯৭৯
জাতীয় মহিলা ব্যাডমিন্টনচ্যাম্পিয়ন ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮০
জাতীয় কাবাডি (মহিলা)চ্যাম্পিয়ন ১৯৮৩; রানার্সআপ ২০০৭
আন্তঃজেলা মহিলা ভলিবলচ্যাম্পিয়ন ১৯৯৮, ১৯৯৯
ফুটবল১৯৯১ সালে অষ্টম সোহরাওয়ার্দী কাপে চ্যাম্পিয়ন; শেরেবাংলা কাপে একাধিকবার আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন
ক্রিকেটজাতীয় যুব ক্রিকেটে বহুবার আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন

১৯৭৪ সালের কাবাডি জয়

জেলার ক্রীড়া ইতিহাসে ১৯৭৪ সালটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। সে বছর ভারতের জাতীয় কাবাডি দল বাংলাদেশ সফরে এসে বেশ কয়েকটি দলকে হারায়, কিন্তু আলী হোসেনের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল জেলা দলের কাছে পরাজিত হয় — জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিবরণে এই জয়কেই টাঙ্গাইলের কাবাডি-যাত্রার সূচনা বলা হয়েছে। পরে রতন দাস বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের অধিনায়ক হিসেবে ভারতে দলকে নেতৃত্ব দেন বলেও সেখানে উল্লেখ আছে।

ক্রিকেট ও নারী ক্রীড়াবিদ

টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুল পরপর দুবার জাতীয় স্কুল ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বলে জেলা ক্রীড়া সংস্থা জানিয়েছে। নারীদের মধ্যে কাবাডি, ভলিবল, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন ও অ্যাথলেটিকসে টাঙ্গাইলের খেলোয়াড়েরা জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন; দ্বিতীয় ও চতুর্থ সাফ গেমসে অ্যাথলেটিকস ও সাঁতারে জেলার কয়েকজন নারী বাংলাদেশ দলে ছিলেন।

কৃষ্ণা রাণী সরকার: এ সময়ের তারকা

কৃষ্ণা রাণী সরকার টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া গ্রামের মেয়ে, জন্ম ২০০১ সালে। তিনি ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলেন।

  • ২০১৫ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন।
  • ২০১৮ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী দলে খেলেছেন।
  • ২০২২ সালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ শিরোপা জেতে; ১৯ সেপ্টেম্বর ফাইনালে নেপালকে ৩-১ গোলে হারানোর ম্যাচে তিনি দুটি গোল করেন এবং পুরো আসরে তাঁর গোল ছিল চারটি।
  • ঘরোয়া ফুটবলে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে নারী লিগ জিতেছেন এবং একটি মৌসুমে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন।

ক্রীড়াঙ্গন ও সংগঠন

টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও স্টেডিয়াম

জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিষ্ঠা ১৯৩৮ সালে; শহরের মাঝখানে প্রায় ১০.৫৭ একর জায়গা নিয়ে এর চত্বর। এর অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে একটি স্টেডিয়াম, একটি জিমনেসিয়াম, প্যাভিলিয়ন এবং সাঁতারের জন্য স্টেডিয়ামসংলগ্ন একটি পুকুর। স্টেডিয়ামটির দর্শক ধারণক্ষমতা নিয়ে সূত্রভেদে ভিন্নতা আছে — জেলা বাতায়ন প্রায় ৩০ হাজার বলেছে, অন্য একটি সূত্রে ২৫ হাজার উল্লেখ আছে। সংস্থাটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীনে পরিচালিত হয় এবং এর আওতায় ১২টি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা রয়েছে।

নিয়মিত প্রতিযোগিতা

জেলা ক্রীড়া সংস্থা প্রতি বছর প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল ও ক্রিকেট লিগ, আন্তঃউপজেলা ফুটবল, স্কুল ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, ভলিবল, দাবা ও হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে ঢাকার নামী ক্লাবগুলোও অংশ নিয়েছে। এর আগে স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক আজগর খান রিজিয়া মেমোরিয়াল কাপ ও আরফান খান চ্যালেঞ্জ গোল্ড শিল্ড নামে দুটি টুর্নামেন্ট পরিচালনা করতেন। জেলা শহরে থানাপাড়া ক্লাব, মুসলিম রেনেসাঁ ক্লাব, ইস্ট এন্ড ক্লাব, দিঘুলিয়া স্পোর্টিং ক্লাবসহ বহু ক্লাব সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ

জেলার স্কুল-কলেজের মাঠগুলোও খেলোয়াড় তৈরির বড় জায়গা। স্কুল ও কলেজের তালিকা পাবেন স্কুল ও কলেজ পাতায়।

তথ্যসূত্র

সাধারণ প্রশ্ন

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো কী কী?

বাংলাপিডিয়ার তালিকায় টাঙ্গাইলের প্রচলিত খেলার মধ্যে আছে লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, কাবাডি (হা-ডু-ডু), ষাঁড়ের লড়াই ও ঘোড়দৌড়, সঙ্গে ভাড়া ভুঁডা, চঙ্গদৌড়, ঢোপবাড়ী, গামছাবাড়ী ও টুংকী বাড়ীর মতো স্থানীয় খেলা।

সন্তোষ ট্রফির নাম কার নামে রাখা হয়েছে?

সন্তোষ ট্রফির নাম রাখা হয়েছে টাঙ্গাইলের সন্তোষের মহারাজা স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরীর নামে, যিনি ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। প্রতিযোগিতাটি ১৯৪১ সালে শুরু হয়।

ফুটবলার কৃষ্ণা রাণী সরকারের বাড়ি কোথায়?

কৃষ্ণা রাণী সরকারের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া গ্রামে। তিনি ২০২২ সালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী বাংলাদেশ দলের ফরোয়ার্ড।

টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

জেলা ক্রীড়া সংস্থার তথ্যমতে টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্রে ১৯৩৮ সালে ১০.৫৭ একর জমির ওপর সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আওতায় এখন ১২টি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা কাজ করে।

কাবাডিতে টাঙ্গাইলের সাফল্য কী?

টাঙ্গাইল পুরুষদের জাতীয় কাবাডিতে ১৯৭৫, ১৯৭৭ ও ১৯৮১ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৭৬ ও ১৯৭৮ সালে রানার্সআপ হয়েছে। ১৯৭৪ সালে টাঙ্গাইল জেলা দল সফররত ভারতীয় জাতীয় কাবাডি দলকে হারিয়েছিল।

মূল সূত্র: টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — খেলাধুলা ও বিনোদন

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কোনো ভুল চোখে পড়লে আমাদের জানান — আমরা স্বচ্ছভাবে সংশোধন করি। সম্পাদকীয় নীতি