দেলদুয়ারে গজনবী লোহানি পরিবারের দেয়ালঘেরা একতলা জমিদার বাড়ি 'নর্থ হাউজ'; পারিবারিক কবরস্থান, মসজিদ ও আমবাগানে ঘেরা ঔপনিবেশিক স্থাপনা।
যাওয়ার আগে নিশ্চিত হোন: অক্টোবর ২০২৬-এ অনলাইন ম্যাপে স্থানটি "সাময়িকভাবে বন্ধ" দেখানো হচ্ছে। দর্শনার্থীদের জন্য এখন খোলা কিনা আমরা যাচাই করতে পারিনি, তাই স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে যান।
পরিচিতি
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় অবস্থিত গজনবী লোহানি পরিবারের ঐতিহাসিক বাসভবন, যা অনেকের কাছে "নর্থ হাউজ" নামে পরিচিত। জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে এটি টাঙ্গাইলের দর্শনীয় স্থানের তালিকায় আছে।
এ অঞ্চলের বেশির ভাগ জমিদার পরিবার ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী; দেলদুয়ারের জমিদাররা ছিলেন মুসলমান, যাঁদের পূর্বপুরুষ আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন। এই পরিবার থেকেই উঠে এসেছেন অবিভক্ত বাংলার দুই আলোচিত ব্যক্তিত্ব, স্যার আবদুল করিম গজনবী ও স্যার আবদুল হালিম গজনবী। ফলে বাড়িটি শুধু স্থাপত্য নয়, বাংলার রাজনীতি, শিক্ষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
ইতিহাস ও নামকরণ
জেলা পোর্টাল অনুযায়ী জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ফতেহদাদ খান গজনবী লোহানি, তবে বাড়িটি ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সে তথ্য পাওয়া যায় না। পূর্বপুরুষরা আফগানিস্তানের গজনী থেকে এসেছিলেন বলে বংশধররা নামের শেষে "গজনবী লোহানি" ব্যবহার করতেন।
আবদুল হাকিম খান গজনবী ও করিমুন নেসা খানম চৌধুরানীর দুই ছেলে আবদুল করিম ও আবদুল হালিম। তাঁদের মা করিমুন নেসা ছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার বোন। স্যার আবদুল করিম গজনবী (১৮৭২–১৯৩৯) ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পড়াশোনা করেন এবং ১৮৯৪ সালে জমিদারির দায়িত্ব নেন। ব্রিটিশ আমলে তিনি দুবার মন্ত্রী হন, আর ১৯২৮ ও ১৯৩৩ সালে নাইট ও নবাব বাহাদুর উপাধি পান। ইংরেজিতে লেখা তাঁর তিনটি বইয়ের কথাও পোর্টালে আছে।
ছোট ভাই স্যার আবদুল হালিম গজনবী (জন্ম ১৮৭৬) ব্যবসা ও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ইন্ডিয়া স্টিমশিপ কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং কলকাতার মুসলিম চেম্বার অব কমার্স ও ইন্ডিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ছিলেন; ১৯৩৫ সালে নাইট উপাধি পান। জীবনের শেষ চার বছর তিনি কলকাতা ছেড়ে এই বাড়িতে কাটান এবং ১৯৫৩ সালে এখানেই মারা যান। দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এই জমিদারিরও অবসান ঘটে।
সাহিত্যের সঙ্গেও বাড়িটির যোগ আছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, মীর মশাররফ হোসেন ১৮৮৫ সালে দেলদুয়ার এস্টেটে কাজে যোগ দেন। দেলদুয়ার উপজেলা পোর্টালে বলা হয়েছে, "বিষাদ-সিন্ধু" উপন্যাসটি তিনি এই জমিদার বাড়িতে বসেই লিখেছিলেন।
যা যা দেখবেন
দেয়ালঘেরা মূল ভবন
চারদিকে প্রাচীরঘেরা একতলা বাড়িটি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়া। উপজেলা পোর্টালের ভাষ্যে বাড়িটি এখনো নতুনের মতো দেখায় এবং এর কারুকাজ চমৎকার। উইকিপিডিয়াও জানায়, একজন তত্ত্বাবধায়ক দেখাশোনা করায় এটি অন্য অনেক জমিদার বাড়ির মতো অবহেলায় পড়ে নেই।
পারিবারিক কবরস্থান ও মসজিদ
বাড়ির সামনের দিকে জমিদার পরিবারের কবরস্থান, আর পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একটি মসজিদ রয়েছে। এ দুটি জায়গায় নীরবতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখুন।
বাগান, ফোয়ারা ও টালির শেড
পূর্ব পাশে লোহার গার্ডেন চেয়ার, গোল টেবিল আর একটি কৃত্রিম পানির ফোয়ারা আছে। বাড়ির পেছনের আমবাগানের মাঝখানে টালির ছাউনির একটি দোতলা শেড দাঁড়িয়ে আছে; ধারণা করা হয়, এটি ছিল বাড়ির নারীদের আড্ডার জায়গা।
ভ্রমণের সেরা সময়
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুকনো মৌসুমে বাগান ও প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা আরামদায়ক। দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে সকাল বা বিকেলে যাওয়াই ভালো।
খাওয়াদাওয়া
দেলদুয়ার উপজেলা সদরের বাজারে সাধারণ খাবারের দোকান পাওয়া যায়। ফেরার পথে টাঙ্গাইল শহরে জেলার বিখ্যাত পোড়াবাড়ির চমচম চেখে দেখতে পারেন।
থাকার ব্যবস্থা
টাঙ্গাইল শহর থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসাই সুবিধাজনক। রাতে থাকতে হলে টাঙ্গাইল শহরে আবাসনের সুযোগ বেশি। একই উপজেলার আতিয়া মসজিদ ও আদম কাশ্মিরীর মাজারও ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন।
ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা
- বাড়িটি একজন তত্ত্বাবধায়কের দেখাশোনায় থাকে; তাঁর অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢুকবেন না।
- অনলাইনে "সাময়িকভাবে বন্ধ" দেখানো হচ্ছে, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে খোলা আছে কিনা জেনে নিন।
- কবরস্থান ও মসজিদের কাছে নীরব থাকুন, শালীন পোশাক পরুন।
- ফোয়ারা, আসবাব বা বাগানের গাছে হাত দেবেন না।
- বাসিন্দাদের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
- প্রাঙ্গণে কোনো আবর্জনা ফেলবেন না।
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি (নর্থ হাউজ)-এ কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে
ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল শহরে আসুন; উইকিপিডিয়ায় ঢাকার মহাখালী থেকে টাঙ্গাইল হয়ে দেলদুয়ারে যাওয়ার পথের কথা বলা আছে।
টাঙ্গাইল শহর থেকে
শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সরাসরি দেলদুয়ার উপজেলা সদরে যাওয়া যায়। সদরে পৌঁছে "জমিদার বাড়ি" বা "গজনবী বাড়ি" জিজ্ঞেস করলে স্থানীয়রা পথ দেখিয়ে দেবেন।
নিজস্ব গাড়িতে
দেলদুয়ার সদরে পৌঁছে বাড়ির প্রবেশপথ আটকে না রেখে বাইরে গাড়ি রাখুন।
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি (নর্থ হাউজ)
দেলদুয়ার উপজেলা, টাঙ্গাইল
ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।
সাধারণ প্রশ্ন
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি কোথায়?
টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায়। টাঙ্গাইল শহর থেকে সড়কপথে দেলদুয়ার সদরে গিয়ে বাড়িটিতে পৌঁছানো যায়।
এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা কে?
ফতেহদাদ খান গজনবী লোহানি। বাড়িটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা সরকারি তথ্য বাতায়নে উল্লেখ নেই।
এই পরিবারের বিখ্যাত সদস্য কারা?
স্যার আবদুল করিম গজনবী ও স্যার আবদুল হালিম গজনবী। দুজনই ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে নাইট উপাধি পেয়েছিলেন।
মীর মশাররফ হোসেনের সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্ক কী?
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তিনি ১৮৮৫ সালে দেলদুয়ার এস্টেটে কাজ করেছেন। উপজেলা পোর্টালের দাবি, "বিষাদ-সিন্ধু" তিনি এখানেই লিখেছিলেন।
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি (নর্থ হাউজ) কোথায় অবস্থিত?
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি (নর্থ হাউজ) টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় অবস্থিত।
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি (নর্থ হাউজ)-এ কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে: ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল শহরে আসুন; উইকিপিডিয়ায় ঢাকার মহাখালী থেকে টাঙ্গাইল হয়ে দেলদুয়ারে যাওয়ার পথের কথা বলা আছে। টাঙ্গাইল শহর থেকে: শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সরাসরি দেলদুয়ার উপজেলা সদরে যাওয়া যায়। সদরে পৌঁছে "জমিদার বাড়ি" বা "গজনবী বাড়ি" জিজ্ঞেস করলে স্থানীয়রা পথ দেখিয়ে দেবেন। নিজস্ব গাড়িতে: দেলদুয়ার সদরে পৌঁছে বাড়ির প্রবেশপথ আটকে না রেখে বাইরে গাড়ি রাখুন।
দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি (নর্থ হাউজ) ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি; সকাল বা বিকেল, যাওয়ার আগে খোলা আছে কিনা জেনে নিন
তথ্যসূত্র
- দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি — টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন
- উপজেলার ঐতিহ্য — দেলদুয়ার উপজেলা তথ্য বাতায়ন
- দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি — বাংলা উইকিপিডিয়া
- Hossain, Mir Mosharraf — Banglapedia
- Wikidata Q64343593
লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।
সূত্র: সরকারি তথ্য বাতায়ন (জেলা/উপজেলা পোর্টাল); সরেজমিন যাচাই বাকি· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

