মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ
আতিয়া জামে মসজিদের বাইরের দৃশ্য, দেলদুয়ার

টাঙ্গাইল ভ্রমণ গাইড

আতিয়া মসজিদ

Atia Mosque

ছবি: Ilham hossain · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

ধরন
ধর্মীয় স্থান
অবস্থান
দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল
শহর থেকে (সোজা দূরত্ব)
প্রায় ৭.৫ কিমি
সেরা সময়
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
পড়তে লাগবে
৬ মিনিট

দেলদুয়ারের আতিয়া গ্রামে লৌহজং নদীর পাড়ে সতেরো শতকের মোগল আমলের মসজিদ; টেরাকোটা অলংকরণ আর চালাঘরের মতো বাঁকা কার্নিশের জন্য বিখ্যাত।

পরিচিতি

আতিয়া মসজিদ (Atia Mosque) টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে অবস্থিত। জেলা শহর থেকে এর অবস্থান মোটামুটি ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে, লৌহজং নদীর পূর্ব তীরে। আকারে ছোট হলেও বাংলার মধ্যযুগীয় মসজিদ-স্থাপত্যের আলোচনায় এই ইমারতের নাম বারবার আসে, কারণ এতে সুলতানি আমলের অলংকরণরীতি আর মোগল আমলের কাঠামোগত ধারা পাশাপাশি দেখা যায়।

মসজিদটি এখনো সক্রিয় উপাসনালয়; এখানে নিয়মিত জামাতে নামাজ হয়। একই সঙ্গে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। তাই এখানে বেড়াতে আসা মানে একটি জীবন্ত ধর্মীয় স্থানে অতিথি হওয়া, আবার চারশো বছরের পুরোনো একটি স্থাপত্য-নিদর্শন কাছ থেকে দেখার সুযোগও পাওয়া।

ইতিহাস ও নামকরণ

বাংলাপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে বায়েজীদ খান পন্নীর ছেলে সাঈদ খান পন্নী সুফি সাধক শাহ বাবা কাশ্মীরির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মসজিদটি তৈরি করান। এই সাধকের আগমনের পর থেকেই আতিয়া এলাকার গুরুত্ব বাড়ে বলে উল্লেখ আছে। নির্মাতা মসজিদের পশ্চিম পাশে একটি বড় পুকুরও কাটিয়েছিলেন।

নির্মাণের সাল নিয়ে দুটি শিলালিপির তথ্যে সামান্য অমিল আছে। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত মূল শিলালিপিতে ১০১৯ হিজরি (১৬১০–১১ খ্রিস্টাব্দ) লেখা। অন্যদিকে মসজিদের মাঝের দরজার ওপরে বসানো অনুরূপ লিপিটিতে ১০১৮ হিজরির (মোটামুটি ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দ) উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ নির্মাণকাল সতেরো শতকের একেবারে শুরুর দিকে, এ নিয়ে সূত্রগুলো একমত।

পরবর্তী সময়ে মসজিদটি দুবার মেরামত হয়েছে: ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরানীর উদ্যোগে এবং ১৯০৯ সালে আবু আহমেদ গজনবীর উদ্যোগে। এক সময় প্রধান গম্বুজটি ভেঙে পড়েছিল, পরে সেটি নতুন করে গড়া হয়।

নামের উৎস নিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ায় বলা আছে, আরবি ‘আতা’ শব্দ থেকে ‘আতিয়া’ এসেছে, যার অর্থ দান। কথিত আছে, ধর্মপ্রচারের ব্যয় নির্বাহের জন্য এই এলাকাটি সাধক বাবা আদম কাশ্মীরিকে ওয়াকফ হিসেবে দান করা হয়েছিল, সেখান থেকেই এই নাম।

যা যা দেখবেন

নকশা ও গম্বুজ

বাইরের দিক থেকে মাপলে মসজিদটি প্রায় ১৮.২৯ মিটার লম্বা ও ১২.১৯ মিটার চওড়া, আর দেয়াল প্রায় ২.২৩ মিটার পুরু। মূল নামাজঘরটি বর্গাকার, মাথায় একটিমাত্র বড় গম্বুজ, যা আট কোনা ড্রামের ওপর বসানো। পূর্ব দিকে লাগোয়া আয়তাকার বারান্দার ওপর রয়েছে তুলনামূলক ছোট তিনটি গম্বুজ। বড় গম্বুজটি স্কুইঞ্চ পদ্ধতিতে আর বারান্দার গম্বুজগুলো পেন্ডেন্টিভ পদ্ধতিতে তৈরি। ছোট গম্বুজগুলোর গায়ে আগে খাঁজকাটা নকশা ছিল, এখন চুনের প্রলেপে তা ঢাকা পড়েছে।

প্রবেশপথ ও মিহরাব

পূর্ব দেয়ালে খিলানযুক্ত তিনটি দরজা আছে, মাঝেরটি দুপাশের দুটির চেয়ে একটু বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালেও দুটি করে দরজা। খিলানগুলো চতুষ্কেন্দ্রিক ধাঁচের। ভেতরে পশ্চিম (কিবলা) দেয়ালে তিনটি অলংকৃত মিহরাব চোখে পড়বে।

কোনার বুরুজ

চার কোনায় চারটি অষ্টভুজ বুরুজ ছাদের কার্নিশ ছাড়িয়ে উঠে গেছে। নির্দিষ্ট ব্যবধানে আড়াআড়ি রেখার কারুকাজে এগুলো কয়েকটি স্তরে ভাগ করা, আর মাথায় ছোট গম্বুজ ও কলস আকৃতির চূড়া।

টেরাকোটা অলংকরণ

পূর্ব ও উত্তর দিকের দেয়াল সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখার মতো। পোড়ামাটির ছোট ছোট আয়তাকার প্যানেলে ফুল, চক্রাকার রোজেট আর জ্যামিতিক নকশা পুরো দেয়াল জুড়ে ছড়ানো। বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের প্যানেল-সজ্জার মিল খুঁজে পান গৌড়ের ঝনঝনিয়া মসজিদ (১৫৩৫) ও কদম রসুল ইমারতের (১৫৩০) সঙ্গে।

বাঁকা কার্নিশ

ছাদের কিনারা সোজা নয়, ধনুকের মতো বাঁকানো। গ্রামবাংলার খড়ের চালাঘরের ঝুলে পড়া চালের আদলটি এখানে ইটে রূপ পেয়েছে, যা বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য-বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয়। পশ্চিম দেয়ালের মাথায় দুর্গের মতো খাঁজকাটা প্যারাপেটও খেয়াল করুন।

পুকুর ও মাজার

নির্মাতার কাটানো বড় পুকুরটি মসজিদের পশ্চিম দিকে। কাছেই সাধক বাবা আদম কাশ্মীরির মাজার রয়েছে বলে উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ আছে; সেখানে গেলে মাজারের পরিবেশ ও নিয়ম মেনে চলুন।

টাকার নোটে আতিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের দশ টাকার নোটে এই মসজিদের ছবি ছাপা হয়েছিল, তাই অনেকের কাছে চেহারাটি আগে থেকেই চেনা।

ভ্রমণের সেরা সময়

বছরের যেকোনো সময় যাওয়া যায়। তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুকনো ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় খোলা চত্বরে হাঁটা আর দেয়ালের কারুকাজ খুঁটিয়ে দেখা সবচেয়ে আরামদায়ক। টেরাকোটার খাঁজে আলো-ছায়ার খেলা দেখতে চাইলে সকালের দিকে বা পড়ন্ত বিকেলে যান। জুমার দিনে দুপুরে ভিড় বেশি থাকে, তাই নিরিবিলি দেখতে চাইলে অন্য দিন বেছে নিন।

খাওয়াদাওয়া

মসজিদ চত্বরে খাওয়ার ব্যবস্থা আশা করবেন না। আশপাশের বাজারে হালকা নাশতা পাওয়া যেতে পারে, তবে ভালো খাবারের জন্য টাঙ্গাইল শহরই ভরসা। টাঙ্গাইলে এসে জেলার পরিচিত মিষ্টি পোড়াবাড়ির চমচম চেখে দেখতে পারেন।

থাকার ব্যবস্থা

শহর থেকে দূরত্ব কম বলে এটি সহজেই একদিনের ভ্রমণ। ঢাকা থেকে ভোরে রওনা দিলে দেখে সন্ধ্যার মধ্যে ফেরা সম্ভব। রাতে থাকতে চাইলে টাঙ্গাইল শহরে থাকার জায়গা খুঁজে নিন।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • এটি সক্রিয় মসজিদ; শালীন পোশাক পরুন, নারীরা মাথা ঢেকে রাখলে ভালো।
  • নামাজের ওয়াক্তে ভেতরে ঘোরাঘুরি বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন, জামাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
  • ভেতরে ঢোকার আগে জুতা খুলে নির্ধারিত জায়গায় রাখুন।
  • এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি; দেয়ালে কিছু লেখা বা টেরাকোটা খোঁটা ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে এবং আইনত দণ্ডনীয়।
  • ছবি তোলার সময় নামাজরত মুসল্লিদের মুখ ক্যামেরায় না আনাই ভদ্রতা।
  • পুকুরপাড় বর্ষায় পিচ্ছিল হতে পারে, শিশুদের দিকে নজর রাখুন।
  • পরিদর্শনের সময় ও নিয়ম বদলাতে পারে; যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।

আতিয়া মসজিদ-এ কীভাবে যাবেন

  1. ঢাকা থেকে

    মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইলগামী বাস নিয়মিত ছাড়ে; ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল পৌঁছানো যায়; ঈদের সময় ও যানজটে সময় অনেক বেশি লাগে।

  2. টাঙ্গাইল শহর থেকে

    শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পাথরাইল বটতলা পর্যন্ত আসুন। সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে, চাইলে হেঁটেও, আতিয়া মসজিদে পৌঁছানো যায়। শহর থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। ভাড়া সময়ভেদে বদলায়, তাই ওঠার আগে ঠিক করে নিন।

  3. নিজস্ব গাড়িতে

    টাঙ্গাইল শহর থেকে দেলদুয়ারমুখী সড়ক ধরে পাথরাইল হয়ে আটিয়ায় এসে মসজিদ রোডে ঢুকুন। মসজিদের সামনের পথ সরু, গাড়ি একটু দূরে রেখে হেঁটে যাওয়াই সুবিধাজনক।

  4. আতিয়া মসজিদ

    দেলদুয়ার উপজেলা, টাঙ্গাইল

ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

আতিয়া মসজিদ কোথায় অবস্থিত?

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে, লৌহজং নদীর পূর্ব তীরে। জেলা শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার, দক্ষিণ দিকে।

আতিয়া মসজিদ কে নির্মাণ করেন?

সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বায়েজীদ খান পন্নীর ছেলে সাঈদ খান পন্নী শাহ বাবা কাশ্মীরির সম্মানে মসজিদটি নির্মাণ করান।

আতিয়া মসজিদ কত সালে নির্মিত?

জাতীয় জাদুঘরে রাখা শিলালিপি অনুযায়ী ১০১৯ হিজরি, অর্থাৎ ১৬১০–১১ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদের দরজার ওপরের লিপিতে ১০১৮ হিজরি লেখা, তাই কোনো কোনো সূত্রে ১৬০৮–০৯ সালও পাওয়া যায়।

আতিয়া মসজিদ কি দশ টাকার নোটে আছে?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ ব্যাংকের দশ টাকার নোটে আতিয়া মসজিদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।

এখানে কি এখনো নামাজ হয়?

হ্যাঁ, মসজিদটিতে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায় হয়, পাশাপাশি এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনা।

আতিয়া মসজিদ-এ কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে: মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইলগামী বাস নিয়মিত ছাড়ে; ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল পৌঁছানো যায়; ঈদের সময় ও যানজটে সময় অনেক বেশি লাগে। টাঙ্গাইল শহর থেকে: শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পাথরাইল বটতলা পর্যন্ত আসুন। সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে, চাইলে হেঁটেও, আতিয়া মসজিদে পৌঁছানো যায়। শহর থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। ভাড়া সময়ভেদে বদলায়, তাই ওঠার আগে ঠিক করে নিন। নিজস্ব গাড়িতে: টাঙ্গাইল শহর থেকে দেলদুয়ারমুখী সড়ক ধরে পাথরাইল হয়ে আটিয়ায় এসে মসজিদ রোডে ঢুকুন। মসজিদের সামনের পথ সরু, গাড়ি একটু দূরে রেখে হেঁটে যাওয়াই সুবিধাজনক।

আতিয়া মসজিদ ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?

নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি; সকাল বা পড়ন্ত বিকেল, নামাজের ওয়াক্ত এড়িয়ে

তথ্যসূত্র

লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।

· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কাছের আরও দর্শনীয় স্থান

সব দেখুন
বিনোদন ও পার্ক•টাঙ্গাইল সদর

পোড়াবাড়ী (চমচমের গ্রাম)

টাঙ্গাইল সদরের পোড়াবাড়ী—জিআই স্বীকৃত পোড়াবাড়ির চমচমের জন্মভূমি। শহর থেকে অল্প দূরে ধলেশ্বরীর পাড়ের এই গ্রামে মিষ্টির ঐতিহ্যের খোঁজে যান ভোজনরসিকেরা।

সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার
ঐতিহাসিক স্থাপনা•টাঙ্গাইল সদর

মওলানা ভাসানীর মাজার, সন্তোষ

টাঙ্গাইল শহরের উত্তর-পশ্চিমে সন্তোষে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সমাধি, পাশেই ঐতিহাসিক দরবার হল ও পীর শাহ জামান দিঘি।

বিনোদন ও পার্ক•টাঙ্গাইল সদর

টাঙ্গাইল শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান

টাঙ্গাইল শহরের মাঝখানে নিরালা মোড়ের কাছে পৌরসভার উদ্যান; পূর্বে বড় মুক্তমঞ্চ, উত্তরে শহীদ মিনার, মেলা-অনুষ্ঠানে শহরের প্রধান মিলনস্থল।