মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ
মহেড়া জমিদার বাড়ির প্রাসাদের সম্মুখভাগ, মির্জাপুর

টাঙ্গাইল ভ্রমণ গাইড

মহেড়া জমিদার বাড়ি

Mohera Zamindar Bari

ছবি: Ilham hossain · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

ধরন
ঐতিহাসিক স্থাপনা
অবস্থান
মির্জাপুর, টাঙ্গাইল
শহর থেকে (সোজা দূরত্ব)
প্রায় ১৬ কিমি
সেরা সময়
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
পড়তে লাগবে
৫ মিনিট

মির্জাপুরের মহেড়ায় ১৮৯০ সাল নাগাদ গড়া সাহা জমিদারদের প্রাসাদ — চার লজ, বিশাখা সাগর দিঘি আর বাগান; এখন পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের ভেতরে।

পরিচিতি

মহেড়া জমিদার বাড়ি (Mohera Zamindar Bari) টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়ায় অবস্থিত। ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাজার থেকে এটি আনুমানিক চার কিলোমিটার পূর্বে, আর টাঙ্গাইল সদর থেকে দূরত্ব মোটামুটি ১৮ কিলোমিটার। জেলা প্রশাসনের দর্শনীয় স্থানের তালিকায় এর নাম রয়েছে।

ঢাকার কাছের জমিদার বাড়িগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গোছানো অবস্থায় টিকে থাকা নিদর্শনগুলোর একটি। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে বাড়িটি পুলিশের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই ভবন আর আঙিনা নিয়মিত দেখভাল পায়। একই প্রাঙ্গণে আলাদা আলাদা স্থাপত্যরীতিতে গড়া চারটি লজ, বড় দিঘি আর বাগান একসঙ্গে দেখা যায় বলে দিনের ভ্রমণে এটি জনপ্রিয় গন্তব্য।

ইতিহাস ও নামকরণ

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, কলকাতা থেকে আসা দুই ভাই কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা ১৮৯০ সাল নাগাদ মহেড়ায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পাটের পাশাপাশি লবণের ব্যবসাও তাঁদের ছিল। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, জমিদারি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। বাংলা উইকিপিডিয়ায় এমন কথাও আছে যে বাড়িটির নকশায় স্পেনের করডোভা নগরীর ছাপ ছিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এখানে হামলা চালায়। তাতে জমিদার পরিবারের এক কুলবধূসহ পাঁচজন নিহত হন। এরপর পরিবারটি লৌহজং নদীপথে দেশ ছেড়ে চলে যায়, আর বাড়িটিতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প বসে।

জেলা ও উপজেলা তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নানের উদ্যোগে এখানে আঞ্চলিক পুলিশ ট্রেনিং স্কুল চালু হয়। ১৯৯০ সালে সেটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে (পিটিসি) উন্নীত হয়। বর্তমানে পুরো প্রাঙ্গণ পুলিশ বিভাগের নিয়ন্ত্রণে।

যা যা দেখবেন

বিশাখা সাগর ও প্রবেশপথ

বাড়িতে ঢোকার আগেই চোখে পড়বে ‘বিশাখা সাগর’ নামের বিশাল দিঘি। ভেতরে ঢোকার জন্য রয়েছে দুটি সুদৃশ্য ফটক। দিঘির দক্ষিণ পাশে আছে বড় একটি আমবাগান।

চৌধুরী লজ

মূল ফটক পেরোলেই প্রথমে পড়ে গোলাপি রঙের দোতলা চৌধুরী লজ। এর স্তম্ভগুলো রোমান ধাঁচের, আর ভেতরের ছাদ ঢেউখেলানো। সামনে বাগান আর খোলা সবুজ মাঠ।

মহারাজ লজ

বাইজেন্টাইন রীতিতে গড়া এই গোলাপি ভবনের সামনে ছয়টি স্তম্ভ, বাঁকানো রেলিংয়ের সিঁড়ি আর ঝুলন্ত বারান্দা। ভবনে বারোটি কক্ষ আছে; সামনে বাগান, পেছনে টেনিস কোর্ট। নাটক-সিনেমার শুটিংয়েও ভবনটি ব্যবহৃত হয়।

আনন্দ লজ

প্রাঙ্গণের সবচেয়ে নজরকাড়া ভবন বলে পরিচিত। নীল-সাদা রঙের এই তিনতলা ভবনের সামনে আটটি স্তম্ভ আর প্রতিটি তলায় ঝুলন্ত বারান্দা। সামনের বাগানে হরিণ, বাঘসহ নানা প্রাণীর ভাস্কর্য রাখা আছে।

কালীচরণ লজ

জমিদারি প্রথার শেষ পর্বে তৈরি এই ভবনের গড়ন বাকিগুলোর চেয়ে আলাদা — ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের আদলে, ইংরেজ রীতিতে গড়া। বিকেলের আলোয় ভবনের ভেতরে আলো-ছায়ার খেলা চোখে পড়ে।

পুকুর, বাগান ও অন্যান্য স্থাপনা

মূল ভবনের পেছনে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর নামে আরও দুটি পুকুর আর ফুলবাগান আছে। এ ছাড়া প্রাঙ্গণে নায়েবের ঘর, কাছারি ঘর ও গোমস্তাদের ঘরের মতো জমিদারি দপ্তরের স্থাপনাগুলোও দেখা যায়।

ভ্রমণের সেরা সময়

শীতকাল, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, খোলা প্রাঙ্গণে হাঁটার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। গরমের দিনে সকালের দিকে বা বিকেলে যাওয়া ভালো; বিকেলের নরম আলোয় ভবনগুলোর রং আর কারুকাজ ছবিতেও ভালো আসে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ভিড় বেশি হয়, তাই নিরিবিলি ঘুরতে চাইলে কর্মদিবস বেছে নিতে পারেন।

খাওয়াদাওয়া

প্রাঙ্গণটি একটি সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, তাই ভেতরে খাবারের ব্যবস্থার ওপর ভরসা না করাই ভালো। মহাসড়কের পাশের নাটিয়াপাড়া বা আশপাশের বাজারে সাধারণ খাবারের দোকান পাওয়া যায়। টাঙ্গাইলে এলে জেলার পরিচিত মিষ্টি পোড়াবাড়ির চমচমের স্বাদ নিতে পারেন।

থাকার ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরা সহজ, তাই রাত কাটানোর দরকার সাধারণত পড়ে না। থাকতে চাইলে মির্জাপুর উপজেলা সদর বা টাঙ্গাইল শহরে আবাসনের খোঁজ করুন।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • জায়গাটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার; প্রবেশের সময় ও নিয়ম কর্তৃপক্ষ ঠিক করে, তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নিন।
  • ভেতরে ঢুকতে টিকিট লাগে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে; মূল্য সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই গেটে জেনে নিন।
  • প্রশিক্ষণ এলাকা, ব্যারাক বা নিষিদ্ধ অংশে ঢুকবেন না, আর প্রশিক্ষণরত সদস্যদের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
  • ভাস্কর্য বা পুরোনো ভবনের দেয়ালে ওঠা, দাগ কাটা বা হেলান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • দিঘি ও পুকুরের ধারে শিশুদের দিকে নজর রাখুন।
  • আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন; প্রাঙ্গণটির পরিচ্ছন্নতাই এর বড় আকর্ষণ।

মহেড়া জমিদার বাড়ি-এ কীভাবে যাবেন

  1. ঢাকা থেকে

    মহাখালী থেকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইলগামী বাসে উঠুন। জেলা তথ্য বাতায়নের নির্দেশনা অনুযায়ী, জামুর্কী পেরিয়ে টাঙ্গাইলের দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার এগিয়ে ডুবাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে নামতে পারেন। অনেকে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডেও নামেন।

  2. টাঙ্গাইল শহর থেকে

    ঢাকামুখী বাসে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ডুবাইল এলাকায় নামুন, অথবা নাটিয়াপাড়াতেই নামুন। সেখান থেকে রিকশা, টেম্পু বা অটোরিকশায় মহাসড়ক ছেড়ে পূর্ব-দক্ষিণ দিকের আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সড়ক ধরে প্রায় চার কিলোমিটার গেলে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের ফটক।

  3. নিজস্ব গাড়িতে

    মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বা ডুবাইল অংশ থেকে মহেড়া পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের দিকের সড়ক ধরুন। পার্কিংয়ের জায়গা গেটে জেনে নিন।

  4. মহেড়া জমিদার বাড়ি

    মির্জাপুর উপজেলা, টাঙ্গাইল

ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

মহেড়া জমিদার বাড়ি কোথায় অবস্থিত?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়ায়, ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাজার থেকে আনুমানিক চার কিলোমিটার পূর্বে।

মহেড়া জমিদার বাড়ি কে নির্মাণ করেন?

উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, কলকাতা থেকে আসা কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা নামের দুই ভাই ১৮৯০ সাল নাগাদ এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।

এখন জমিদার বাড়িটি কী কাজে ব্যবহৃত হয়?

১৯৭২ সালে এখানে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল চালু হয়, যা ১৯৯০ সালে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত হয়। প্রাঙ্গণটি এখন পুলিশ বিভাগ পরিচালনা করে।

প্রবেশ ফি আছে কি?

সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে টিকিট কেটে ঢোকার কথা আছে, তবে মূল্য বদলাতে পারে। যাওয়ার আগে বা গেটে বর্তমান নিয়ম জেনে নিন।

এখানে কয়টি লজ আছে?

চারটি — চৌধুরী লজ, মহারাজ লজ, আনন্দ লজ ও কালীচরণ লজ।

মহেড়া জমিদার বাড়ি-এ কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে: মহাখালী থেকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইলগামী বাসে উঠুন। জেলা তথ্য বাতায়নের নির্দেশনা অনুযায়ী, জামুর্কী পেরিয়ে টাঙ্গাইলের দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার এগিয়ে ডুবাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে নামতে পারেন। অনেকে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডেও নামেন। টাঙ্গাইল শহর থেকে: ঢাকামুখী বাসে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ডুবাইল এলাকায় নামুন, অথবা নাটিয়াপাড়াতেই নামুন। সেখান থেকে রিকশা, টেম্পু বা অটোরিকশায় মহাসড়ক ছেড়ে পূর্ব-দক্ষিণ দিকের আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সড়ক ধরে প্রায় চার কিলোমিটার গেলে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের ফটক।

মহেড়া জমিদার বাড়ি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?

নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি; সকাল বা বিকেল, ছুটির দিনে ভিড় বেশি

তথ্যসূত্র

লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।

· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কাছের আরও দর্শনীয় স্থান

সব দেখুন
ধর্মীয় স্থান•মির্জাপুর

পাকুল্লা মসজিদ

মির্জাপুরের পাকুল্লায় ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে তিন গম্বুজের প্রাচীন মসজিদ; মোগল ধাঁচের খাঁজকাটা খিলান আর পলেস্তারার নকশা দেখার মতো।

ঐতিহাসিক স্থাপনা•মির্জাপুর

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর

মির্জাপুরে লৌহজংয়ের তীরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার গড়া কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস—সেবা, নারীশিক্ষা আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী এক ঐতিহাসিক চত্বর।

ঐতিহাসিক স্থাপনা•টাঙ্গাইল সদর

সরকারি সা'দত কলেজ, করটিয়া

১৯২৬ সালে ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর প্রতিষ্ঠিত করটিয়ার সা'দত কলেজ, যাকে 'বাংলার আলীগড়' বলা হয়। প্রায় শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাস টাঙ্গাইল সদরে।