মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ
মধুপুর শালবনের সবুজ চাঁদোয়া

টাঙ্গাইল ভ্রমণ গাইড

মধুপুর জাতীয় উদ্যান

Madhupur National Park

ছবি: Antar Kubi · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

ধরন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
অবস্থান
মধুপুর, টাঙ্গাইল
শহর থেকে (সোজা দূরত্ব)
প্রায় ৫৪ কিমি
সেরা সময়
অক্টোবর–মার্চ
পড়তে লাগবে
৫ মিনিট

মধুপুর উপজেলার লালমাটির গড়ে শালবনঘেরা দেশের প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যান; হনুমান, বানর, পাখি আর হরিণ প্রজনন কেন্দ্র দেখতে প্রকৃতিপ্রেমীরা আসেন।

পরিচিতি

মধুপুর জাতীয় উদ্যান টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায়, মধুপুর গড় নামে পরিচিত লালমাটির উঁচু ভূমিতে ছড়িয়ে আছে। টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে, ঢাকা থেকে মোটামুটি ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে এর অবস্থান। জেলা তথ্য বাতায়নে জায়গাটি "রসুলপুর জাতীয় উদ্যান" নামেও তালিকাভুক্ত। উদ্যানটি দেখভাল করে বন অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল বন বিভাগ।

আয়তন প্রায় ৮,৪৩৬ হেক্টর (২০ হাজার ৮০০ একরের কিছু বেশি)। বাংলাপিডিয়া একে দেশের প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যানগুলোর একটি বলেছে। বিস্তীর্ণ শালবনের একটি অংশ নিয়ে গড়া এই উদ্যানে শাল (স্থানীয় নাম গজারি) গাছেরই আধিপত্য। বন আর তার আশপাশে গারো (মান্দি) ও কোচ জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাই এখানে প্রকৃতির পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতিরও পরিচয় মেলে।

ইতিহাস ও নামকরণ

১৯৬২ সালে তৎকালীন সরকার এই বনাঞ্চলকে উদ্যান হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। পরে ১৯৮২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায় একে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। একসময় এই বনে হাতি, বাঘ, চিতাবাঘ, ময়ূরের মতো প্রাণী ছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে এদের বেশির ভাগই এখন আর দেখা যায় না। আগের তুলনায় বনের আয়তনও অনেক কমে এসেছে বলে নানা সূত্রের মত।

যা যা দেখবেন

শালবন ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য

বাংলাপিডিয়ার হিসাবে উদ্যানে ১৭৬ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এর মধ্যে ৭৩টি বৃক্ষ, ২২টি গুল্ম, ২৭টি লতানো উদ্ভিদ, ৪৫টি ঔষধি গাছ, ৮টি ঘাস আর ১টি পামজাতীয় প্রজাতি। বনের প্রায় ৪০ শতাংশ জুড়ে শাল। এর সঙ্গে বহেড়া, আমলকী, হলদু, আমড়া, জিগার মতো গাছও চোখে পড়ে। এখানকার ভূমি সমতল চূড়ার ছোট টিলা (চালা) আর মাঝের নিচু জমি (বাইদ) দিয়ে গড়া। ঢাল কম বলে হাঁটা তুলনামূলক সহজ।

বন্যপ্রাণী ও পাখি

উদ্যানে প্রায় ১৯০ প্রজাতির প্রাণীর খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে ২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪০ প্রজাতির পাখি আর ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ। ভাগ্য ভালো হলে হনুমান, বানর, মায়া হরিণ, শজারু বা বুনো শূকরের দেখা পেতে পারেন। দুর্লভ মুখপোড়া হনুমান এই বনের অন্যতম পরিচিত বাসিন্দা। পাখি দেখতে চাইলে ভোরবেলাই সবচেয়ে ভালো।

প্রধান ফটক, হাঁটাপথ ও হরিণ প্রজনন কেন্দ্র

রসুলপুরে প্রধান ফটকের পাশেই উদ্যানের রেঞ্জ অফিস আর সহকারী বন সংরক্ষকের কার্যালয়। ফটক থেকে ইট বিছানো একটি হাঁটাপথ বনের ভেতরে ঢুকে গেছে। বনের প্রায় মাঝখানে, লহরিয়া বিট অফিসের কাছে আছে একটি হরিণ প্রজনন কেন্দ্র। উইকিপিডিয়ায় দোখলা এলাকার একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের ছবিও আছে।

বিশ্রামাগার, পিকনিক স্পট ও লেক

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উদ্যানে বিশ্রামাগার, পিকনিক স্পট আর একটি কৃত্রিম লেক আছে। এগুলো ব্যবহার করতে হলে বিভাগীয় বন কার্যালয়ে আগে বুকিং দিতে হয়। জেলা তথ্য বাতায়নের দর্শনীয় স্থানের তালিকায় দোখলা বিশ্রামাগারের নামও আছে।

মহাসড়কের ওপর রজ্জুপথ

টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ মহাসড়ক বনটাকে দুই ভাগ করে গেছে। খাবারের খোঁজে রাস্তা পার হতে গিয়ে বানর, হনুমান, মেছোবিড়াল, গন্ধগোকুলের মতো প্রাণী প্রায়ই গাড়িচাপা পড়ে। এই মৃত্যু কমাতে ২০২৬ সালে বন বিভাগ উদ্যানের সদর রেঞ্জ এলাকায় মহাসড়কের ওপর পাঁচটি রোপওয়ে বানিয়েছে। এখন গাছে থাকা প্রাণীরা ওপর দিয়ে গাছ থেকে গাছে নিরাপদে পার হতে পারে।

ভ্রমণের সেরা সময়

বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক অক্টোবর থেকে মার্চ। এই এলাকায় মে মাসে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে, আর জানুয়ারিতে ১০ ডিগ্রির কাছাকাছি নামে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর বর্ষাকাল। তখন বন সবচেয়ে সবুজ থাকে, কিন্তু ভেতরের পথ কাদায় পিচ্ছিল হয়ে যায়। প্রাণী আর পাখি দেখতে চাইলে সকালে যান, আর সন্ধ্যা নামার আগেই বন থেকে বেরিয়ে আসুন।

খাওয়াদাওয়া

বনের ভেতরে খাবারের দোকানের ওপর ভরসা না করাই ভালো। পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন, তবে মোড়ক বা বোতল বনে ফেলবেন না। মধুপুর শহরে সাধারণ খাবার পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে মধুপুরের আনারস ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। মৌসুমে গেলে স্থানীয় আনারস চেখে দেখতে পারেন।

থাকার ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়, তবে পথ লম্বা বলে ভোরে রওনা দেওয়া ভালো। উদ্যানের বিশ্রামাগারে থাকতে চাইলে টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কার্যালয়ে আগে থেকে বুকিং দিতে হয়। এ ছাড়া মধুপুর উপজেলা সদর আর টাঙ্গাইল শহরে থাকার ব্যবস্থা আছে।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • প্রধান ফটকের রেঞ্জ অফিস থেকে অনুমতি আর দিকনির্দেশনা নিয়ে তবেই বনে ঢুকুন।
  • নির্ধারিত পথের বাইরে একা গভীর বনে যাবেন না, দল বেঁধে চলুন।
  • বানর-হনুমানকে খাবার দেবেন না। খাবারের আশাতেই ওরা মহাসড়কে নেমে এসে দুর্ঘটনায় পড়ে।
  • মহাসড়কের যে অংশ বনের ভেতর দিয়ে গেছে, সেখানে গাড়ি ধীরে চালান।
  • জোরে গান বাজাবেন না, আগুন জ্বালাবেন না, গাছের ডালও ভাঙবেন না।
  • বর্ষায় গেলে শক্ত তলার জুতা পরুন, আর জোঁক ও কাদার জন্য তৈরি থাকুন।
  • স্থানীয় গারো ও কোচ বসতিতে ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
  • খোলার সময় আর প্রবেশের নিয়ম বদলাতে পারে। যাওয়ার আগে বন বিভাগ থেকে জেনে নিন।

মধুপুর জাতীয় উদ্যান-এ কীভাবে যাবেন

  1. ঢাকা থেকে

    ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল পার হয়ে টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ সড়ক দিয়ে মধুপুরের দিকে যেতে হয়। জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী ঢাকা থেকে মধুপুর পর্যন্ত সরাসরি বাস চলে। মধুপুর উপজেলায় কোনো রেললাইন নেই, তাই এ পথে সড়কই একমাত্র ভরসা।

  2. টাঙ্গাইল শহর থেকে

    ময়মনসিংহগামী সড়ক ধরে উত্তরে মধুপুরের দিকে এগোলে রসুলপুর মাজার নামের জায়গায় বাঁ দিকে উদ্যানের প্রধান ফটক পড়ে। মধুপুর বা ময়মনসিংহগামী বাসে রসুলপুরে নামা যায়। মধুপুর শহর থেকে স্থানীয় অটোরিকশা বা সিএনজিতেও ফটক পর্যন্ত যাওয়া যায়।

  3. নিজস্ব গাড়িতে

    বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া অংশে গতি কমিয়ে চালান, রাস্তা পার হওয়া প্রাণীর দিকে চোখ রাখুন। গাড়ি কোথায় রাখবেন, তা রেঞ্জ অফিসে জিজ্ঞেস করে নিন।

  4. মধুপুর জাতীয় উদ্যান

    মধুপুর উপজেলা, টাঙ্গাইল

ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

মধুপুর জাতীয় উদ্যান কোথায় অবস্থিত?

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায়, টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে। টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহের পথে রসুলপুর মাজার এলাকায় বাঁ দিকে উদ্যানের প্রধান ফটক।

মধুপুর জাতীয় উদ্যান কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

১৯৬২ সালে বনটিকে উদ্যান হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয় ১৯৮২ সালে।

উদ্যানের আয়তন কত?

প্রায় ৮,৪৩৬ হেক্টর, অর্থাৎ ২০ হাজার একরের বেশি।

বনে ঢুকতে কি অনুমতি লাগে?

হ্যাঁ। প্রধান ফটকের পাশের রেঞ্জ অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হয়। বিশ্রামাগার বা পিকনিক স্পট ব্যবহার করতে চাইলে বিভাগীয় বন কার্যালয়ে আগে বুকিং দিতে হয়।

মধুপুর বনে কোন কোন প্রাণী দেখা যায়?

হনুমান, বানর, মায়া হরিণ, শজারু, বুনো শূকর আর ১৪০ প্রজাতির পাখি। এদের মধ্যে দুর্লভ মুখপোড়া হনুমান উল্লেখযোগ্য।

মধুপুর জাতীয় উদ্যান-এ কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে: ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল পার হয়ে টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ সড়ক দিয়ে মধুপুরের দিকে যেতে হয়। জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী ঢাকা থেকে মধুপুর পর্যন্ত সরাসরি বাস চলে। মধুপুর উপজেলায় কোনো রেললাইন নেই, তাই এ পথে সড়কই একমাত্র ভরসা। টাঙ্গাইল শহর থেকে: ময়মনসিংহগামী সড়ক ধরে উত্তরে মধুপুরের দিকে এগোলে রসুলপুর মাজার নামের জায়গায় বাঁ দিকে উদ্যানের প্রধান ফটক পড়ে। মধুপুর বা ময়মনসিংহগামী বাসে রসুলপুরে নামা যায়। মধুপুর শহর থেকে স্থানীয় অটোরিকশা বা সিএনজিতেও ফটক পর্যন্ত যাওয়া যায়। নিজস্ব গাড়িতে: বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া অংশে গতি কমিয়ে চালান, রাস্তা পার হওয়া প্রাণীর দিকে চোখ রাখুন।

মধুপুর জাতীয় উদ্যান ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?

অক্টোবর–মার্চ; প্রাণী ও পাখি দেখতে সকালবেলা, সন্ধ্যার আগে ফেরা

তথ্যসূত্র

লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।

· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কাছের আরও দর্শনীয় স্থান

সব দেখুন
জলছত্র আনারসের হাট
বিনোদন ও পার্ক•মধুপুর

জলছত্র আনারসের হাট

মধুপুরের জলছত্র আনারসের প্রধান পাইকারি হাট; মৌসুমে জিআই-স্বীকৃত মধুপুরের আনারস এখান থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে যায়।

মধুপুরের রাবার বাগান (পীরগাছা/সন্তোষপুর)
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য•মধুপুর

মধুপুরের রাবার বাগান (পীরগাছা/সন্তোষপুর)

মধুপুর গড়ে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চারটি রাবার বাগান, প্রায় ৭,৫০০ একর; পীরগাছা-সন্তোষপুরে সারি সারি গাছ আর ভোরে কষ সংগ্রহ দেখা যায়।

বিনোদন ও পার্ক•মধুপুর

কাকরাইদ বীজ উৎপাদন খামার (বিএডিসি)

মধুপুরের কাকরাইদে বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামার — জেলা প্রশাসনের দর্শনীয় স্থানের তালিকাভুক্ত সবুজ ক্যাম্পাস, রাবার বাগানের পথে পড়ে।