মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ
টাঙ্গাইল প্রান্ত থেকে সূর্যাস্তে যমুনা সেতু

টাঙ্গাইল ভ্রমণ গাইড

যমুনা সেতু

Jamuna Bridge

ছবি: Armanaziz at English Wikipedia · Public domain · উইকিমিডিয়া কমন্স

ধরন
বিনোদন ও পার্ক
অবস্থান
ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল
শহর থেকে (সোজা দূরত্ব)
প্রায় ২২ কিমি
সেরা সময়
অক্টোবর–মার্চ
পড়তে লাগবে
৫ মিনিট

ভূঞাপুর ও সিরাজগঞ্জকে যুক্ত করা প্রায় ৪.৮ কিমি দীর্ঘ যমুনা সেতু ১৯৯৮ সালে চালু হয়; পূর্ব প্রান্ত থেকে বিশাল যমুনা আর দুই সেতুর দৃশ্য দেখা যায়।

পরিচিতি

যমুনা সেতু (Jamuna Bridge) যমুনা নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ৪.৮ কিলোমিটার লম্বা বহুমুখী সেতু। এর পূর্ব প্রান্ত টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায়, পশ্চিম প্রান্ত সিরাজগঞ্জে। দৈর্ঘ্যে এটি দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু, আর উদ্বোধনের সময় বিশ্বের দীর্ঘ সেতুগুলোর তালিকায় এগারো নম্বরে ছিল।

যমুনা দেশের তিন প্রধান নদীর একটি, আর পানিপ্রবাহের হিসাবে পৃথিবীর বড় নদীগুলোর মধ্যে পড়ে। সেতু হওয়ার আগে নদীর দুই পারের মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ছিল পুরোপুরি ফেরিনির্ভর, যা প্রায়ই নাব্যতা সংকটে ব্যাহত হতো। আজ ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলের সড়কপথের প্রধান যোগসূত্র এই সেতু। টাঙ্গাইলবাসীর কাছে এর পূর্ব প্রান্ত বিকেলে নদী দেখার এক প্রিয় জায়গাও।

ইতিহাস ও নামকরণ

যমুনার ওপর সেতুর দাবি রাজনৈতিকভাবে প্রথম তোলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ১৯৪৯ সালে। পরের কয়েক দশকে নানা সমীক্ষা হলেও প্রকল্পটি বারবার পিছিয়ে যায়। ১৯৮৫ সালের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালের সমীক্ষায় সিরাজগঞ্জ ও ভূঞাপুরের মধ্যবর্তী অংশকে সেতুর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

১৯৯৪ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় একই বছরের ১৫ অক্টোবর। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুটি যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন। অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের আইডিএ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপানের ওইসিএফ যুক্ত ছিল।

চালুর পর সেতুটির নাম রাখা হয় ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সেতু বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নাম বদলে ‘যমুনা সেতু’ করা হয়।

যা যা দেখবেন

বহুমুখী সেতুর গঠন

সেতুটি নদীর তলদেশে গাঁথা ইস্পাতের নলাকার পাইলের ওপর দাঁড়িয়ে, পিলার মোট ৫০টি। মূল অংশে প্রায় ৯৯ মিটারের ৪৯টি স্প্যান আছে, ডেকের মোট প্রস্থ সাড়ে আঠারো মিটার। শুধু গাড়ি নয়, এই সেতু দিয়ে নদী পার হয়েছে উচ্চচাপের গ্যাস পাইপলাইন, ২৩০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও টেলিযোগাযোগের তার। বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ডেকের উত্তর পাশে বাড়তি কাঠামোর ওপর বসানো, যা দূর থেকেই চোখে পড়ে।

রেললাইন সরিয়ে চওড়া সড়ক

শুরুতে সেতুর উত্তর পাশে ডুয়েল গেজ রেললাইন ছিল। পাশের যমুনা রেলসেতু চালু হওয়ায় ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এই সেতু দিয়ে ট্রেন চলা বন্ধ হয়, পরে রেললাইন তুলে সড়কের জায়গা বাড়ানো হয়েছে।

দুই সেতুর দৃশ্য

সেতুর মাত্র কয়েকশো মিটার উত্তরে সমান্তরালভাবে দাঁড়িয়ে আছে নতুন যমুনা রেলসেতু। পূর্ব প্রান্তের নদীতীর থেকে একসঙ্গে দুটি সেতু, চর আর দিগন্তজোড়া জলরাশি দেখা যায়। শুকনো মৌসুমে নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, আর বর্ষায় কূল ছাপানো স্রোত—দুই রূপই আলাদা অভিজ্ঞতা দেয়।

মেরামতের ইতিহাস

চালুর এক দশকের মধ্যে সেতুর ডেকে ফাটল ধরা পড়ে। ২০০৬ সালে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা কারণ খতিয়ে দেখেন, পরে কার্বন ফাইবার দিয়ে মজবুতকরণসহ ধাপে ধাপে মেরামত হয় এবং সেতুর অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

ভ্রমণের সেরা সময়

অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত আবহাওয়া শুকনো ও মনোরম, নদীতীরে হাঁটার জন্য এটাই সেরা সময়। সূর্যাস্তের আগে-পরে পশ্চিম আকাশের রঙ নদীতে প্রতিফলিত হয়, তাই বিকেলে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করুন। বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) নদী পূর্ণ যৌবনে থাকে, দৃশ্য নাটকীয় হলেও স্রোত প্রবল, তখন নৌকায় না ওঠাই ভালো। ঈদের আগে-পরে মহাসড়কে যানজট তীব্র হয়, এই সময়টা এড়িয়ে চলুন।

খাওয়াদাওয়া

সেতুর পূর্ব প্রান্তে বা এলেঙ্গা মোড়ে মহাসড়কের পাশে সাধারণ খাবারের দোকান পাওয়া যায়। যমুনার তাজা মাছ এলাকায় সহজলভ্য, তবে দাম ও মান দেখে নিন। টাঙ্গাইল শহর হয়ে ফিরলে পোড়াবাড়ির চমচম নিতে ভুলবেন না।

থাকার ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসা যায়। রাতে থাকতে চাইলে ভূঞাপুর উপজেলা সদর, এলেঙ্গা বা টাঙ্গাইল শহরে থাকার জায়গা খুঁজতে পারেন; আগে থেকে বুকিং নিশ্চিত করে নিন।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • সেতুর ওপর গাড়ি থামানো, হাঁটা বা ছবি তোলার জন্য দাঁড়ানো নিরাপদ নয় এবং অনুমোদিতও নয়; নদীতীরের খোলা জায়গা থেকে দৃশ্য দেখুন।
  • সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা; নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলুন, সংরক্ষিত এলাকায় ড্রোন ওড়াবেন না।
  • নৌকায় নদী ঘুরতে চাইলে লাইফজ্যাকেট ছাড়া উঠবেন না, আর আবহাওয়া খারাপ হলে পরিকল্পনা বাতিল করুন।
  • চরে নামলে বালুর নরম অংশ ও স্রোতের কাছাকাছি জায়গা এড়িয়ে চলুন।
  • সেতু পার হতে টোল দিতে হয়; হার সেতু কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে এবং সময়ে সময়ে বদলায়।
  • নদীতীরে প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট ফেলে আসবেন না।

যমুনা সেতু-এ কীভাবে যাবেন

  1. ঢাকা থেকে

    ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল পেরিয়ে এলেঙ্গা পৌঁছান, সেখান থেকে পশ্চিমে সংযোগ সড়ক গেছে সেতুর পূর্ব প্রান্তে। উত্তরবঙ্গগামী প্রায় সব বাস এই সেতু দিয়ে চলে, তবে সেতুর আগে নামতে চাইলে চালককে আগেই বলে রাখুন। ট্রেনে এলে টাঙ্গাইল প্রান্তের ইব্রাহিমাবাদ স্টেশন সেতুর কাছেই।

  2. টাঙ্গাইল শহর থেকে

    শহর থেকে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উত্তরে এলেঙ্গা, সেখান থেকে সেতুর পূর্ব প্রান্তের দিকে যাওয়া যায়। ভূঞাপুর উপজেলা সদর থেকেও অটোরিকশায় সেতু এলাকায় পৌঁছানো যায়।

  3. নিজস্ব গাড়িতে

    এলেঙ্গা থেকে সেতু সংযোগ সড়ক ধরুন। নদী দেখতে চাইলে সেতুতে ওঠার আগেই পূর্ব প্রান্তে নির্ধারিত জায়গায় গাড়ি রাখুন; সেতু পার হলে টোল দিতে হবে।

  4. যমুনা সেতু

    ভূঞাপুর উপজেলা, টাঙ্গাইল

ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

যমুনা সেতু কোথায় অবস্থিত?

যমুনা নদীর ওপর, পূর্ব তীরে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর আর পশ্চিম তীরে সিরাজগঞ্জের মাঝে।

যমুনা সেতুর দৈর্ঘ্য কত?

প্রায় ৪.৮ কিলোমিটার। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু।

যমুনা সেতু কবে চালু হয়?

১৯৯৮ সালের ২৩ জুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু সেতু আর যমুনা সেতু কি একই?

হ্যাঁ। চালুর পর এর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু সেতু; ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রজ্ঞাপনে নাম হয় যমুনা সেতু।

এখন কি যমুনা সেতু দিয়ে ট্রেন চলে?

না। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রেন পাশের যমুনা রেলসেতু দিয়ে চলছে।

যমুনা সেতু-এ কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে: ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল পেরিয়ে এলেঙ্গা পৌঁছান, সেখান থেকে পশ্চিমে সংযোগ সড়ক গেছে সেতুর পূর্ব প্রান্তে। উত্তরবঙ্গগামী প্রায় সব বাস এই সেতু দিয়ে চলে, তবে সেতুর আগে নামতে চাইলে চালককে আগেই বলে রাখুন। ট্রেনে এলে টাঙ্গাইল প্রান্তের ইব্রাহিমাবাদ স্টেশন সেতুর কাছেই। টাঙ্গাইল শহর থেকে: শহর থেকে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উত্তরে এলেঙ্গা, সেখান থেকে সেতুর পূর্ব প্রান্তের দিকে যাওয়া যায়। ভূঞাপুর উপজেলা সদর থেকেও অটোরিকশায় সেতু এলাকায় পৌঁছানো যায়। নিজস্ব গাড়িতে: এলেঙ্গা থেকে সেতু সংযোগ সড়ক ধরুন।

যমুনা সেতু ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?

অক্টোবর–মার্চ; বিকেল থেকে সূর্যাস্ত

তথ্যসূত্র

লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।

· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কাছের আরও দর্শনীয় স্থান

সব দেখুন
যমুনা সেতু ও যমুনা রেলসেতু পাশাপাশি
বিনোদন ও পার্ক•ভূঞাপুর

যমুনা রেলসেতু

যমুনা সেতুর উত্তরে প্রায় ৪.৮ কিমি দীর্ঘ ডুয়েল-গেজ ডাবল লাইনের রেলসেতু; ১৮ মার্চ ২০২৫ উদ্বোধন হয়, টাঙ্গাইল প্রান্তের স্টেশন ইব্রাহিমাবাদ।

হেমনগর জমিদার বাড়ি (রাজবাড়ি), গোপালপুর
ঐতিহাসিক স্থাপনা•গোপালপুর

হেমনগর জমিদার বাড়ি

গোপালপুরের হেমনগরে ১৮৯০ সালে জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরীর গড়া দোতলা প্রাসাদ, ছাদের দুই পরীর ভাস্কর্যে যার ডাকনাম 'পরীর দালান'—জীর্ণ হলেও কারুকাজে মুগ্ধ করে।

টাঙ্গাইল শহরের ডিসি লেক
বিনোদন ও পার্ক•টাঙ্গাইল সদর

ডিসি লেক

টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্রে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কাছে লেক ও উদ্যান; হাঁটার পথ, বসার জায়গা আর শিশু পার্কসহ শহরবাসীর বিকেলের প্রিয় জায়গা।