মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ

টাঙ্গাইল ভ্রমণ গাইড

পাকুল্লা মসজিদ

Pakulla Mosque

ধরন
ধর্মীয় স্থান
অবস্থান
মির্জাপুর, টাঙ্গাইল
শহর থেকে (সোজা দূরত্ব)
প্রায় ১৬ কিমি
সেরা সময়
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি
পড়তে লাগবে
৫ মিনিট

মির্জাপুরের পাকুল্লায় ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে তিন গম্বুজের প্রাচীন মসজিদ; মোগল ধাঁচের খাঁজকাটা খিলান আর পলেস্তারার নকশা দেখার মতো।

পরিচিতি

পাকুল্লা মসজিদ টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্লায় অবস্থিত একটি পুরোনো তিন গম্বুজ মসজিদ। ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে মির্জাপুর পেরিয়ে উত্তরে এগোলে পাকুল্লা বাজার পড়ে, আর বাজারের পশ্চিম পাশে মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়ভাবে এটি "পাকুল্যা শাহী জামে মসজিদ" নামেও পরিচিত।

মহাসড়কের এত কাছে থাকায় টাঙ্গাইল যাওয়া-আসার পথে অল্প সময় হাতে রেখেই মসজিদটি দেখে নেওয়া যায়। উপজেলা প্রশাসনের তথ্যে এটিকে মির্জাপুরের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়েছে, আর বাংলাপিডিয়ায় এর স্থাপত্য নিয়ে আলাদা নিবন্ধ আছে। যাঁরা আতিয়া মসজিদ দেখেছেন, তাঁরা এখানে এসে টাঙ্গাইল অঞ্চলের মোগল-পরবর্তী সময়ের আরেকটি ধারার কাজ মিলিয়ে দেখতে পারেন।

ইতিহাস ও নামকরণ

মসজিদে কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি, তাই কে বা কবে এটি তৈরি করেছিলেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বাংলাপিডিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তারিখ জানা কয়েকটি স্থাপনার সঙ্গে এর গড়নের মিল আছে। যেমন বর্ধমানে খাজা আনোয়ার শহীদের সমাধি (আনুমানিক ১৬৯৮), মানিক পীরের দরগাহ (১৬৯৭) এবং করতলব খান মসজিদ (১৭০৪)। এই মিলের ভিত্তিতে মসজিদটিকে সতেরো শতকের শেষ বা আঠারো শতকের শুরুর দিকের বলে ধরা হয়। বাংলাপিডিয়ার মির্জাপুর উপজেলা নিবন্ধে একে আঠারো শতকের নিদর্শন বলা হয়েছে।

জামুর্কী ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়নে লেখা আছে, নির্মাণের সঠিক সাল স্থানীয়ভাবেও কারও জানা নেই। সেখানে এর বয়স আনুমানিক চার থেকে পাঁচশো বছর বলা হয়েছে। নামটি এসেছে গ্রাম ও বাজারের নাম পাকুল্লা থেকে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও পাকুল্লার নাম আছে। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে, মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লায় একটি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে।

যা যা দেখবেন

আয়তাকার নামাজঘর ও তিন গম্বুজ

বাইরের দিক থেকে মসজিদটি প্রায় ১৪.৭৭ মিটার লম্বা আর ৫.৮৫ মিটার চওড়া। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় সোয়া এক মিটার। ছাদে তিনটি গম্বুজ আছে, প্রতিটি বসানো অষ্টকোণ ড্রামের ওপর। মাঝেরটি দুই পাশের দুটির চেয়ে বড়। গম্বুজের চূড়ায় পদ্ম আর কলসের মোটিফ চোখে পড়ে।

ভেতরের খাঁজকাটা খিলান

ভেতরে ঢুকলে দেখবেন, পূর্ব ও পশ্চিম দেয়াল থেকে ওঠা আড়াআড়ি খাঁজকাটা খিলান নামাজঘরকে তিনটি অসমান অংশে ভাগ করেছে। এ ধরনের খিলান দিল্লির মতি মসজিদ আর ঢাকার হাজি খাজা শাহবাজের মসজিদেও আছে। পাকুল্লার স্থাপত্য বোঝার সবচেয়ে বড় সূত্র এটিই।

মিহরাব ও মিম্বার

পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব আছে। মাঝেরটি বড়, বহু খাঁজের নকশায় তৈরি, বাইরের দিকে খানিকটা বেরিয়ে আছে আর দুই পাশে জোড়া স্তম্ভ রয়েছে। পাশের দুটি মিহরাব সাদামাটা। মাঝের মিহরাবের উত্তরে তিন ধাপের একটি মিম্বার আছে।

সামনের দিক ও কোণের বুরুজ

সামনের দিকে আয়তাকার কাঠামোর ভেতরে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। চার কোণে চারটি অষ্টকোণ বুরুজ ছাদ ছাড়িয়ে উঠে গেছে, আর এদের মাথায় ছোট ছত্রী ও কলস-চূড়া আছে।

দুই পাশের দোচালা কক্ষ

মসজিদের দুই প্রান্তে ইট-পলেস্তারার দুটি দোচালা ধাঁচের ছোট ঘর আছে। মসজিদের ভেতর থেকে এবং পূর্ব দিক থেকে এগুলোতে ঢোকা যায়। এগুলো ঠিক কী কাজে লাগত, জানা যায় না। গবেষকদের অনুমান, এখানে শিক্ষার্থীরা পড়ত অথবা ইমাম থাকতেন।

পলেস্তারার অলংকরণ

দরজার কোণ আর মিহরাবজুড়ে পলেস্তারায় দড়ি, পাতা, ফুল আর জ্যামিতিক নকশা করা আছে। ছাদের কার্নিশ আর ড্রামের চারপাশে আছে পদ্মপাপড়ির সারি। দেয়ালের গায়েও খোপ খোপ প্যানেল নকশা দেখা যায়।

ভ্রমণের সেরা সময়

সারা বছরই যাওয়া যায়। শুষ্ক মৌসুমে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, রোদ নরম থাকে, তাই বাইরের অলংকরণ ভালো করে দেখা যায়। নামাজের সময় এড়িয়ে সকাল বা বিকেলে গেলে ভেতরটা শান্তভাবে দেখার সুযোগ পাবেন।

খাওয়াদাওয়া

পাকুল্লা বাজার ও মহাসড়কের পাশে সাধারণ খাবারের দোকান পাওয়া যায়। টাঙ্গাইল শহরে ফিরলে জেলার বিখ্যাত চমচম চেখে দেখতে পারেন।

থাকার ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরা যায়। রাতে থাকতে চাইলে টাঙ্গাইল শহর বা মির্জাপুর উপজেলা সদরে থাকার ব্যবস্থা খুঁজে নিন।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • এটি এখনো নামাজের জায়গা। শালীন পোশাক পরে যান, আর জামাতের সময় ভেতরে ঘোরাঘুরি করবেন না।
  • নারী দর্শনার্থীরা ভেতরে যাওয়ার আগে মসজিদ কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ম জেনে নিন।
  • বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় দেয়ালে ফাটলের কথা আছে। পুরোনো অলংকরণে হাত দেবেন না, দেয়ালে হেলান দেবেন না।
  • মহাসড়ক পার হওয়ার সময় সাবধান থাকুন। বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
  • ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, বিশেষ করে মুসল্লিদের ছবি তোলার আগে।
  • কাছের পাকুল্যার শ্রী শ্রী রাধা কালাচাঁদ মন্দির একই যাত্রায় দেখে নিতে পারেন।

পাকুল্লা মসজিদ-এ কীভাবে যাবেন

  1. ঢাকা থেকে

    ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইলগামী যেকোনো বাসে উঠে মির্জাপুর পেরিয়ে পাকুল্লা বাসস্ট্যান্ডে নামুন। বাজারের পশ্চিম দিকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই মসজিদ। চালককে আগেই "পাকুল্লা" নামিয়ে দিতে বলে রাখুন।

  2. টাঙ্গাইল শহর থেকে

    মহাসড়ক ধরে দক্ষিণে মির্জাপুরের দিকে এগোলে পাকুল্লা বাজার পড়বে। ঢাকাগামী বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাওয়া যায়। দেলদুয়ার থেকে পাকুল্লা–দেলদুয়ার সড়ক ধরেও সরাসরি পাকুল্লা বাজারে পৌঁছানো যায়।

  3. নিজস্ব গাড়িতে

    মহাসড়কের পাশে বাজার এলাকায় ভিড় থাকে। গাড়ি এমন জায়গায় রাখুন যাতে চলাচলে বাধা না হয়।

  4. পাকুল্লা মসজিদ

    মির্জাপুর উপজেলা, টাঙ্গাইল

ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

পাকুল্লা মসজিদ কোথায় অবস্থিত?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্লায়, ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে পাকুল্লা বাজারের পশ্চিমে।

মসজিদটি কবে তৈরি হয়েছিল?

শিলালিপি না থাকায় সঠিক তারিখ জানা যায় না। স্থাপত্যরীতি দেখে বাংলাপিডিয়া একে সতেরো শতকের শেষ বা আঠারো শতকের শুরুর দিকের বলে মনে করে।

মসজিদটিতে কয়টি গম্বুজ আছে?

তিনটি। প্রতিটি অষ্টকোণ ড্রামের ওপর বসানো, আর মাঝেরটি সবচেয়ে বড়।

মসজিদের দুই পাশের ছোট ঘরগুলো কীসের?

দুই প্রান্তে দুটি দোচালা কক্ষ আছে। এগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত নয়। অনুমান করা হয়, এখানে শিক্ষার্থীরা পড়ত অথবা ইমাম থাকতেন।

পাকুল্লা মসজিদ-এ কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে: ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইলগামী যেকোনো বাসে উঠে মির্জাপুর পেরিয়ে পাকুল্লা বাসস্ট্যান্ডে নামুন। বাজারের পশ্চিম দিকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই মসজিদ। চালককে আগেই "পাকুল্লা" নামিয়ে দিতে বলে রাখুন। টাঙ্গাইল শহর থেকে: মহাসড়ক ধরে দক্ষিণে মির্জাপুরের দিকে এগোলে পাকুল্লা বাজার পড়বে। ঢাকাগামী বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাওয়া যায়। দেলদুয়ার থেকে পাকুল্লা–দেলদুয়ার সড়ক ধরেও সরাসরি পাকুল্লা বাজারে পৌঁছানো যায়। নিজস্ব গাড়িতে: মহাসড়কের পাশে বাজার এলাকায় ভিড় থাকে। গাড়ি এমন জায়গায় রাখুন যাতে চলাচলে বাধা না হয়।

পাকুল্লা মসজিদ ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?

নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি; নামাজের সময় এড়িয়ে সকাল বা বিকেল

তথ্যসূত্র

লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া — পাকুল্লা মসজিদ· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কাছের আরও দর্শনীয় স্থান

সব দেখুন
মহেড়া জমিদার বাড়ির প্রাসাদের সম্মুখভাগ, মির্জাপুর
ঐতিহাসিক স্থাপনা•মির্জাপুর

মহেড়া জমিদার বাড়ি

মির্জাপুরের মহেড়ায় ১৮৯০ সাল নাগাদ গড়া সাহা জমিদারদের প্রাসাদ — চার লজ, বিশাখা সাগর দিঘি আর বাগান; এখন পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের ভেতরে।

ঐতিহাসিক স্থাপনা•মির্জাপুর

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর

মির্জাপুরে লৌহজংয়ের তীরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার গড়া কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস—সেবা, নারীশিক্ষা আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী এক ঐতিহাসিক চত্বর।

ঐতিহাসিক স্থাপনা•টাঙ্গাইল সদর

সরকারি সা'দত কলেজ, করটিয়া

১৯২৬ সালে ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর প্রতিষ্ঠিত করটিয়ার সা'দত কলেজ, যাকে 'বাংলার আলীগড়' বলা হয়। প্রায় শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাস টাঙ্গাইল সদরে।