টাঙ্গাইল সদরের করটিয়ায় পন্নী জমিদারদের প্রাচীরঘেরা বাড়ি; আছে রোকেয়া মহল, লোহার ঘর, দাউদ মহল আর সা'দত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চাঁদ মিয়ার স্মৃতি।
পরিচিতি
করটিয়া জমিদার বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া ইউনিয়নে, শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এটি ছিল জেলার প্রভাবশালী পন্নী জমিদার পরিবারের বসতবাড়ি। এই পরিবারের সবচেয়ে নামকরা সদস্য ওয়াজেদ আলী খান পন্নী। লোকে তাঁকে চাঁদ মিয়া বা "আটিয়ার চাঁদ" নামে চিনত।
উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় বাড়িটি প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা আর আধা কিলোমিটার চওড়া একটি প্রাচীরঘেরা এলাকা জুড়ে। স্থাপত্যে মোগল আর চীনা ধাঁচের মিশেল চোখে পড়ে। ঠিক পাশেই সরকারি সা'দত কলেজ, যেটি চাঁদ মিয়ারই প্রতিষ্ঠা করা। ফলে এখানে এলে টাঙ্গাইলের জমিদারি ইতিহাস আর শিক্ষাবিস্তারের গল্প একসঙ্গে দেখা হয়ে যায়।
ইতিহাস ও নামকরণ
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পন্নী পরিবারের সা'দত আলী খান পন্নী করটিয়ায় বসবাস শুরু করেন, আর তখন থেকেই পরিবারটি করটিয়ার জমিদার হিসেবে পরিচিত হয়। উইকিপিডিয়ায় এই বংশের সূত্র আটিয়া মসজিদের নির্মাতা সাঈদ খান পন্নী পর্যন্ত টানা হয়েছে। উনিশ শতকের শুরুতে সম্পত্তি নিয়ে লম্বা মামলা চলে। শেষে বাংলা ১২২৭ সনে সা'দত আলী খান আর তাঁর স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানম মিলে একটি দলিল করেন। তাতে সম্পত্তির এক ভাগ রাখা হয় পরিবারের খরচের জন্য, অন্য ভাগ ধর্মীয় ও দাতব্য কাজে ওয়াকফ করে দেওয়া হয়।
ওয়াজেদ আলী খান পন্নী করটিয়ায় জন্মেছিলেন ১৮৭১ সালে, মারা যান ১৯৩৬ সালে। জমিদারির আয়ের বড় একটা অংশ তিনি শিক্ষা আর জনকল্যাণে খরচ করতেন। দুর্ভিক্ষ বা বন্যার সময় খাজনা মওকুফেরও ব্যবস্থা রেখেছিলেন। খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় ১৯২১ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন।
১৯২৬ সালে অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁর সহযোগিতায় তিনি করটিয়ায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। দাদা সা'দত আলী খান পন্নীর নামে এর নাম রাখা হয় সা'দত কলেজ। ১৯৭৯ সালে কলেজটি সরকারি হয়। স্ত্রী রোকেয়ার নামে তিনি একটি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ চালাতে ১৯২৬ সালে বিপুল সম্পত্তি ওয়াকফ করে দেন।
বাড়িটি একসময় প্রকাশনারও কেন্দ্র ছিল। চাঁদ মিয়ার বাবা হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৮৪ সালে করটিয়া থেকে "আখবারে ইসলামীয়া" পত্রিকা বের হতো। জমিদার বাড়ির ছাপাখানা থেকে "আতিয়ার ইতিহাস"সহ বেশ কিছু বই ছাপা হয়েছিল। বিশ শতকের গোড়ায় এখানে মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনও হয়েছিল, যার সভাপতি ছিলেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ।
যা যা দেখবেন
রোকেয়া মহল
প্রাচীরের ভেতরে সবচেয়ে নজরকাড়া দালান এটিই, গায়ে মোগল স্থাপত্যরীতির স্পষ্ট ছাপ। উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত একটি প্রতিবেদন বলছে, ভবনটি বিদ্যালয় আর কোচিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
লোহার ঘর
জমিদার বাড়ির যে কটি স্থাপনা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো টিকে আছে বলে বাংলাপিডিয়া জানিয়েছে, লোহার ঘর তার একটি।
দাউদ মহল
জমিদার পরিবারের ছোট তরফের বাসভবন হিসেবে পরিচিত।
রানীর পুকুরঘাট
প্রাঙ্গণের ভেতরের পুকুর, বাঁধানো ঘাটসহ।
মসজিদ
বাড়ির লাগোয়া মোগল ধাঁচের একটি মসজিদ।
সরকারি সা'দত কলেজ
জমিদার বাড়ির পাশেই চাঁদ মিয়ার প্রতিষ্ঠিত কলেজ। একসময় একে "বাংলার আলীগড়" বলা হতো।
ভ্রমণের সেরা সময়
সারা বছরই যাওয়া যায়। তবে প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়ানোর জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুকনো, ঠান্ডা আবহাওয়াই সবচেয়ে আরামের। দালানের কারুকাজের ছবি তুলতে চাইলে সকাল বা পড়ন্ত বিকেলের আলো ভালো। প্রাঙ্গণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় ক্লাসের সময় ভিড় থাকতে পারে।
খাওয়াদাওয়া
করটিয়া বাজার আর টাঙ্গাইল শহরে সাধারণ খাবারের দোকান পাবেন। টাঙ্গাইলে এলে জেলার নিজস্ব মিষ্টি পোড়াবাড়ির চমচম চেখে দেখতে পারেন। জেলা তথ্য বাতায়নেও এটিকে জেলার বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে।
থাকার ব্যবস্থা
ঢাকা থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়। চাইলে একই দিনে কাছের আটিয়া মসজিদও দেখে আসতে পারেন। রাতে থাকতে হলে সবচেয়ে কাছের ভরসা টাঙ্গাইল শহর।
ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা
- প্রাঙ্গণের কিছু অংশে এখনো মানুষ থাকেন, কিছু অংশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলে। কোথায় ঢোকা যাবে, ফটকে জিজ্ঞেস করে নিন।
- বসতঘরের ভেতরের বা বাসিন্দাদের ছবি অনুমতি ছাড়া তুলবেন না।
- মসজিদে শালীন পোশাকে ঢুকুন, আর নামাজের সময়টা এড়িয়ে চলুন।
- পুরোনো দালানের দেয়ালে কিছু লিখবেন না, খোদাই করবেন না। ঝুঁকিপূর্ণ অংশেও উঠবেন না।
- কলেজ খোলা থাকলে ক্লাসের পরিবেশ নষ্ট হয় এমন হইচই করবেন না।
- প্রবেশের নিয়ম ও সময় স্থানীয়ভাবে জেনে নিন। এসব তথ্য আমাদের যাচাই করা নয়।
করটিয়া জমিদার বাড়ি-এ কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল যাওয়া যায়। জেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, ঢাকা থেকে ট্রেনেও টাঙ্গাইল আসা যায়। ট্রেনের সময়সূচি বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন সেবায় দেখে নিন।
টাঙ্গাইল শহর থেকে
শহর থেকে করটিয়া প্রায় ১০ কিলোমিটার। অটোরিকশা বা সিএনজিতে করটিয়ায় নেমে সা'দত কলেজের দিকে এগোলেই জমিদার বাড়ির প্রাচীর চোখে পড়বে। রিকশাতেও যাওয়া যায়।
নিজস্ব গাড়িতে
কলেজ এলাকায় ক্লাসের সময় ভিড় থাকে। গাড়ি কোথায় রাখবেন, স্থানীয়দের কাছে জেনে নিন।
করটিয়া জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা, টাঙ্গাইল
ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।
সাধারণ প্রশ্ন
করটিয়া জমিদার বাড়ি কোথায় অবস্থিত?
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া ইউনিয়নে, টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে।
করটিয়া জমিদার বাড়ি কোন পরিবারের?
টাঙ্গাইলের পন্নী জমিদার পরিবারের। এর সবচেয়ে পরিচিত জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, যিনি চাঁদ মিয়া নামে পরিচিত (১৮৭১–১৯৩৬)।
সা'দত কলেজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, ১৯২৬ সালে। নাম রাখেন দাদা সা'দত আলী খান পন্নীর নামে। কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ইবরাহীম খাঁ।
জমিদার বাড়িতে কী কী দেখা যায়?
রোকেয়া মহল, লোহার ঘর, দাউদ মহল, রানীর পুকুরঘাট আর পাশের মোগল ধাঁচের মসজিদ।
করটিয়া জমিদার বাড়ি-এ কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে: মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে টাঙ্গাইল যাওয়া যায়। জেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, ঢাকা থেকে ট্রেনেও টাঙ্গাইল আসা যায়। ট্রেনের সময়সূচি বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন সেবায় দেখে নিন। টাঙ্গাইল শহর থেকে: শহর থেকে করটিয়া প্রায় ১০ কিলোমিটার। অটোরিকশা বা সিএনজিতে করটিয়ায় নেমে সা'দত কলেজের দিকে এগোলেই জমিদার বাড়ির প্রাচীর চোখে পড়বে। রিকশাতেও যাওয়া যায়। নিজস্ব গাড়িতে: কলেজ এলাকায় ক্লাসের সময় ভিড় থাকে। গাড়ি কোথায় রাখবেন, স্থানীয়দের কাছে জেনে নিন।
করটিয়া জমিদার বাড়ি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?
সারা বছর; নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি আরামদায়ক, সকাল বা বিকেল
তথ্যসূত্র
- বাংলাপিডিয়া — করটিয়া জমিদারি
- বাংলাপিডিয়া — পন্নী, ওয়াজেদ আলী খান
- উইকিপিডিয়া — করটিয়া জমিদার বাড়ি
- উইকিপিডিয়া — সরকারি সা'দত কলেজ
- উইকিউপাত্ত — Q67181236
- টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — জেলা পরিচিতি ও দর্শনীয় স্থান
- টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন — পর্যটন স্পট (যাতায়াত)
লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।
· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

