মূল কনটেন্টে যান

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬•

টাঙ্গাইলTANGAIL.NET
নোটিশ

টাঙ্গাইল ভ্রমণ গাইড

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর

Kumudini Complex and Bharateswari Homes

ধরন
ঐতিহাসিক স্থাপনা
অবস্থান
মির্জাপুর, টাঙ্গাইল
শহর থেকে (সোজা দূরত্ব)
প্রায় ২৫ কিমি
সেরা সময়
সারা বছর
পড়তে লাগবে
৪ মিনিট

মির্জাপুরে লৌহজংয়ের তীরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার গড়া কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস—সেবা, নারীশিক্ষা আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী এক ঐতিহাসিক চত্বর।

পরিচিতি

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা সদরে, লৌহজং নদীর তীরে গড়ে উঠেছে কুমুদিনী কমপ্লেক্স। এর কেন্দ্রে আছে কুমুদিনী হাসপাতাল আর মেয়েদের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতেশ্বরী হোমস। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জায়গাটি ঢাকা থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে আর টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

এটি প্রচলিত অর্থে পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং সচল হাসপাতাল ও স্কুলের চত্বর। তবু দেশের জনকল্যাণের ইতিহাসে এর জায়গা আলাদা। এক মানুষের দানে গ্রামীণ এলাকায় বিনা পয়সার চিকিৎসা আর নারীশিক্ষার এত বড় আয়োজন খুব কমই হয়েছে। ১৯৭১ সালের মির্জাপুর গণহত্যার স্মৃতিও এই চত্বরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

ইতিহাস ও নামকরণ

প্রতিষ্ঠাতা রণদা প্রসাদ সাহা (আর. পি. সাহা)। তাঁর জন্ম ১৮৯৬ সালে, পৈতৃক নিবাস মির্জাপুরে। শৈশবে মা কুমুদিনী দেবী সন্তান প্রসবের সময় ধনুষ্টংকারে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান। পরে দারিদ্র্য পেরিয়ে তিনি সফল ব্যবসায়ী হন এবং আয়ের বড় অংশ মানুষের সেবায় খরচ করেন।

  • কুমুদিনী হাসপাতাল: মায়ের নামে ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ১৯৪৪ সালের ২৭ জুলাই বাংলার তৎকালীন গভর্নর আর. জি. কেসি ২০ শয্যার হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। পরে শয্যা বেড়ে কয়েকশোতে দাঁড়ায়। ১৯৭০ সালে এখানে যক্ষ্মা ওয়ার্ড চালু হয়; তার আগে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা হতো নদীতে ছাউনি দেওয়া নৌকার ভাসমান ওয়ার্ডে।
  • ভারতেশ্বরী হোমস: ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের আবাসিক বিদ্যালয়। নামকরণ পরিবারের পূর্বনারী ভারতেশ্বরী দেবীর নামে। শুরু হয়েছিল ভারতেশ্বরী বিদ্যাপীঠ নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে। শিক্ষায় অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পায়।
  • কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট: ১৯৪৭ সালে নিবন্ধিত এই ট্রাস্ট হাসপাতাল, হোমস, নার্সিং স্কুল, মহিলা মেডিকেল কলেজসহ নানা প্রতিষ্ঠান চালায়। ট্রাস্টটি ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পায়।

১৯৭১: ৭ মে পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে কুমুদিনী চত্বরে রণদা প্রসাদ সাহা ও তাঁর ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহার খোঁজে তল্লাশি চালায়। একই দিনে লৌহজংয়ের তীরের কয়েকটি গ্রামে গণহত্যা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ থেকে বাবা-ছেলেসহ কয়েকজনকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। রণদা প্রসাদ সাহা ১৯৭৮ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পান।

যা যা দেখবেন

লৌহজং তীরের চত্বর

হাসপাতাল ও হোমসের ভবন নিয়ে নদীতীরের পুরো চত্বরটাই এখানকার মূল দৃশ্য। এর ভেতরে চলাফেরা কর্তৃপক্ষের নিয়মের অধীন।

রণদার বাড়ির দুর্গাপূজা

রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজামণ্ডপ মির্জাপুরের পুরনো ও সুপরিচিত আয়োজন। প্রথম আলোর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এর মূল আকর্ষণ বলা হয়েছে সন্ধ্যার আরতিকে। ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রীরা ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই আরতি পরিবেশন করে। সেবার অতিথিদের লৌহজং পার করানোর জন্য বজরা নৌকাও সাজানো হয়েছিল। প্রতিবেদনে আছে, রণদা সর্বজনীন পূজায় বিশ্বাস করতেন, তাই এখানে সব ধর্মের মানুষ আসতে পারেন।

ভারতেশ্বরী হোমসের শরীরচর্চা

হোমসের ছাত্রীদের শরীরচর্চা ও প্রদর্শনী দেশজুড়ে পরিচিত। জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তারা প্রায়ই অংশ নেয়। এসব প্রদর্শনী সাধারণত নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানেই হয়, প্রতিদিন দেখার সুযোগ থাকে না।

ভ্রমণের সেরা সময়

শরৎকালের দুর্গাপূজার সময় (সাধারণত আশ্বিন–কার্তিক, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর–অক্টোবর) এখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসেন। অন্য সময়ে গেলে শীতকালের সকাল বা বিকেল আরামদায়ক। মনে রাখবেন, হাসপাতাল সারা বছর রোগীদের জন্য খোলা থাকে।

খাওয়াদাওয়া

মির্জাপুর বাজার ও মহাসড়কের ধারে সাধারণ খাবারের দোকান পাওয়া যায়। হাসপাতাল চত্বরে খাবার নিয়ে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো।

থাকার ব্যবস্থা

ঢাকা বা টাঙ্গাইল শহর থেকে দিনে গিয়ে ফেরা যায়। রাতে থাকতে হলে টাঙ্গাইল শহরে আবাসনের বেশি বিকল্প আছে।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • এটি সচল হাসপাতাল ও মেয়েদের আবাসিক স্কুল। ভেতরে ঢোকার আগে প্রবেশপথে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নিয়ম জেনে নিন।
  • ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী বা হাসপাতালের রোগীদের ছবি অনুমতি ছাড়া তুলবেন না।
  • হাসপাতাল এলাকায় শব্দ করবেন না, ভিড় করবেন না।
  • পূজার সময় ভিড় বেশি থাকে। শিশু ও মূল্যবান জিনিসের দিকে নজর রাখুন।
  • মণ্ডপে গেলে শালীন পোশাক পরুন এবং আয়োজকদের নির্দেশনা মেনে চলুন।
  • নৌকায় নদী পার হলে নৌকা ভারী হয়ে গেলে উঠবেন না।

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর-এ কীভাবে যাবেন

  1. ঢাকা থেকে

    ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে মির্জাপুর উপজেলা সদর পর্যন্ত যান। টাঙ্গাইলগামী বাসে মির্জাপুরে নামা যায়। সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় লৌহজং তীরের কুমুদিনী চত্বর।

  2. টাঙ্গাইল শহর থেকে

    ঢাকামুখী মহাসড়ক ধরে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ৩০ কিমি গেলে মির্জাপুর। সেখান থেকে স্থানীয় যানে হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়া যায়।

  3. নিজস্ব গাড়িতে

    মহাসড়ক থেকে মির্জাপুর সদরে ঢুকে হাসপাতাল সড়ক ধরে এগোন। চত্বরের ভেতরে পার্কিংয়ের নিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিন।

  4. কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর

    মির্জাপুর উপজেলা, টাঙ্গাইল

ভাড়া, সময় ও রাস্তার অবস্থা বদলায় — রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস কোথায়?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা সদরে, লৌহজং নদীর তীরে। জায়গাটি ঢাকা থেকে প্রায় ৬৫ কিমি এবং টাঙ্গাইল সদর থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে।

কে এগুলো প্রতিষ্ঠা করেন?

দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। হাসপাতালটি ১৯৩৮ সালে, ভারতেশ্বরী হোমস ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দুটিই এখন কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অধীনে চলে।

কুমুদিনী হাসপাতালের নাম কার নামে?

রণদা প্রসাদ সাহার মা কুমুদিনী দেবীর নামে।

সাধারণ দর্শনার্থীরা কি ভেতরে ঘুরতে পারেন?

প্রতিষ্ঠান দুটি সচল, তাই প্রবেশ কর্তৃপক্ষের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। যাওয়ার আগে বা প্রবেশপথে জেনে নিন।

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর কোথায় অবস্থিত?

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় অবস্থিত। টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্র থেকে সোজা দূরত্বে প্রায় ২৫ কিমি।

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর-এ কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে: ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে মির্জাপুর উপজেলা সদর পর্যন্ত যান। টাঙ্গাইলগামী বাসে মির্জাপুরে নামা যায়। সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় লৌহজং তীরের কুমুদিনী চত্বর। টাঙ্গাইল শহর থেকে: ঢাকামুখী মহাসড়ক ধরে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ৩০ কিমি গেলে মির্জাপুর। সেখান থেকে স্থানীয় যানে হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়া যায়। নিজস্ব গাড়িতে: মহাসড়ক থেকে মির্জাপুর সদরে ঢুকে হাসপাতাল সড়ক ধরে এগোন। চত্বরের ভেতরে পার্কিংয়ের নিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিন।

কুমুদিনী কমপ্লেক্স ও ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কখন?

সারা বছর; দুর্গাপূজার সময় বিশেষ আয়োজন, শীতকালে সকাল বা বিকেল

তথ্যসূত্র

লেখাটি এসব সূত্রের তথ্য মিলিয়ে আমাদের নিজের ভাষায় লেখা। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান।

সূত্র: ভারতেশ্বরী হোমস — বাংলাপিডিয়া· শেষ যাচাই: ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেয়ার করুন: ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ

কাছের আরও দর্শনীয় স্থান

সব দেখুন
মহেড়া জমিদার বাড়ির প্রাসাদের সম্মুখভাগ, মির্জাপুর
ঐতিহাসিক স্থাপনা•মির্জাপুর

মহেড়া জমিদার বাড়ি

মির্জাপুরের মহেড়ায় ১৮৯০ সাল নাগাদ গড়া সাহা জমিদারদের প্রাসাদ — চার লজ, বিশাখা সাগর দিঘি আর বাগান; এখন পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের ভেতরে।

ধর্মীয় স্থান•মির্জাপুর

পাকুল্লা মসজিদ

মির্জাপুরের পাকুল্লায় ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে তিন গম্বুজের প্রাচীন মসজিদ; মোগল ধাঁচের খাঁজকাটা খিলান আর পলেস্তারার নকশা দেখার মতো।

পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, নাগরপুর
ঐতিহাসিক স্থাপনা•নাগরপুর

পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি

নাগরপুরের পাকুটিয়ায় ধলেশ্বরীর তীরে একই নকশার তিনটি প্রাসাদ নিয়ে গড়া জমিদার বাড়ি; নারীমূর্তি আর লতাপাতার অলংকরণ দেখতে আসেন অনেকে।